Friday, September 30, 2022
Homeজাতীয়দেশে বজ্রপাতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা

দেশে বজ্রপাতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা

আ.জা. ডেক্স:

দেশে নতুন দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে বজ্রপাত। বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বজ্রপাতে বাংলাদেশেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রাণহাণি ঘটছে। প্রতিবছরই বৃষ্টির মৌসুমে এদেশে বেশি বজ্রপাত হয়। চলতি বছরেও দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মূলত তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া, প্রচুর মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এর রেডিয়েশন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, নদী-নালা ভরাট ও নদী দখলসহ নানা কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত বাড়ার সঙ্গে বিশ্বময় তাপমাত্রা পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত মাস থেকে দেশে প্রায় প্রতিদিনই বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত দেড় মাসে বজ্রপাতে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী বজ্রপাতে এপ্রিলে ১১০ জন ও চলতি মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত ৫৭ জন মারা গেছে। তাছাড়া বজ্রপাতের কারণে একজন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে আশেপাশের অন্তত ১০ জন আহত হয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাব। আর বজ্রপাতে আহতদের প্রায় সবারই স্থায়ীভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাওর ও বিস্তীর্ণ বিল এলাকার জেলাগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলা মাঠে যারা কাজ করে, নৌকায় বা পথঘাটে চলাচল করে, তারাই বজ্রপাতের বেশি শিকার হয়। দেশে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের ঘটনা ১৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। গত এক দশকে অন্য যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সূত্র জানায়, দেশে গত দেড় মাসে বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা গেছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং গাইবান্ধা জেলায়। আর বিভাগের হিসাবে সবচেয়ে সিলেটে বেশি মানুষ মারা গেছে। বজ্রপাতে যারা মারা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই খোলা মাঠে কাজ করছিল বা মাছ ধরছিল। কালবৈশাখীর কারণে এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। বজ্রপাতে মৃতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। এ ব্যাপারে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (প্রাক-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা) ও লাইটেনিং এরেস্টর (বজ্রপাত নিরোধক) স্থাপনের মাধ্যমে মানুষকে রক্ষার পদক্ষেপ নেয়া যায়। আর এ কাজটি সরকারকেই করতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে বজ্রপাতের ব্যাপারে আরো বেশি সচেতন ও সাবধান হতে হবে। কালবৈশাখীর এই সময়ে আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে খোলা মাঠে-ঘাটে কাজ করা যাবে না। বাসাবাড়িতে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাছাড়া মাঠে-ঘাটে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগালে তা বজ্রপাত নিরোধের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবে। অথচ এতোকিছুর পরও কৃষককে ধান কাটতে মাঠে যেতে হবে। তাই বজ্রপাতের প্রকোপ কমাতে হাওর ও বিল অঞ্চলে মোবাইল ফোনের টাওয়ারে লাইটেনিং এরস্টোর লাগিয়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।

অন্যদিকে মোবাইল ফোনের টাওয়ারে লাইটেনিং এরস্টোর লাগানোর বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. সেলিম হোসেন জানান, টাওয়ারে লাইটেনিং এরস্টোর লাগানোর বিষয়ে সরকারিভাবেও বিবেচনা করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এটি লাগানোর পরে একটি টাওয়ার মাত্র ৯০ মিটার এলাকা কাভার করবে। আর একেকটি যন্ত্রের দাম প্রায় ৭ লাখ টাকা। কাভারেজ এলাকার তুলনায় এটা যথেষ্ঠ ব্যয়সাপেক্ষ। তাই পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় ওই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। বর্তমানে বজ্রপাত এলাকা বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি সেসব এলাকায় নতুন গাছ লাগানো এবং বড় গাছ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক গবেষণামতে এদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ৪০টি বজ্রপাত হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম ঝুঁঁকিপূর্ণ দেশ। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments