Saturday, December 3, 2022
Homeশিক্ষাপৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন শিক্ষক হওয়া

পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন শিক্ষক হওয়া

পৃথিবীতে কিছু কিছু মুখ থাকে, যেগুলো চাইলেও ভোলা যায় না; বরং যতই সময় গড়িয়ে যায়, ততই মুখগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রক্তের বন্ধন হয়তো থাকে না সেখানে, তারপরও খুব আপন হয় সে মুখগুলো। যেমন-তৃষিত মাটির আপনজন হয়ে ওঠে মেঘ থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জলরাশি। তীব্র শীতে উদোম শরীরের ছেলেটার আপনজন হয়ে ওঠে এক টুকরো সূর্যের উত্তাপ। খুব চেনা চেনা সেই মুখগুলো, চোখটা বয়সের ছাপে ঝাপসা হলেও মুখগুলো তখনও জ্বলজ্বলে। ঠিক যেমনটা আকাশে ঝুলে থাকা জ্বলজ্বলে তারাগুলো। চশমায় পাওয়ারফুল কাচের লেন্স চোখে লাগিয়ে তখন অন্য সবকিছু ভালো করে দেখার প্রয়োজন হলেও সেই মুখগুলো দেখার জন্য কোনো চশমার প্রয়োজন হয় না; বরং দগদগে কাঁচা ঘায়ের মতো মুখগুলো দেহের ভেতরে প্রবেশ করে জীবনকে যেন নতুন করে চিনিয়ে যায়। কারণ, সেই মুখগুলোয় কখনো কোনো মুখোশ থাকে না; বরং মুখ ও মানুষ থাকে।

যে মানুষটা অনেকটা কুমোরের মতো, কাদামাটি হাতে নিয়ে সেগুলোকে নিজের মতো করে গড়ে। নিজের স্বপ্ন যেখানে অপূর্ণ থেকে যায়, সেখানটায় সেগুলোকে পৌঁছানোর জন্য জীবনকে বাজি রেখে লড়াইয়ে নামে। কখনো চিত্রশিল্পীর মতো হয়ে যায় মানুষটা। জলরং তুলিতে নিয়ে ছবি আঁকে। নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়। ক্লান্তিতে জড়োসড়ো শরীর অতৃপ্তিটা মুছে ফেলার প্রাণান্ত চেষ্টা করে। কিছুই হয়তো নেই মানুষটার; অথচ যা আছে তা নিঃসন্দেহে অমূল্য। পৃথিবীর মানুষের সাধ্য নেই সে অমূল্য রতনকে কিনবার, সে অমূল্য রতনকে তাদের কেনা দাস বানানোর। রঙের বিন্যাস তার ছবিতে বৈচিত্র্য আনে, চিন্তার রংছবির ভেতরের রংকেও ছাপিয়ে যায় কখনো কখনো। তারপরও মানুষটা থেমে থাকে না। তার সংসারের টানাপোড়েনটা আধুনিক পৃথিবীর বাণিজ্যিক মানুষের চোখে হয়তো ধরা পড়ে না কখনো; কিন্তু মানুষটা তো ত্যাগের শরীর নিয়ে তৈরি, ভোগের লোভ তার শরীরের কোথাও দাগ ফেলার মতো সাহস দেখাতে পারে না।

খুব সাধারণ একটা মানুষের কথা বলছি, যাকে মানুষ প্রিয়জন হয়তো মনে করে না; বরং তার প্রয়োজন মনে করে। খুব সুদর্শন নয় হয়তো, তারপরও মস্তিষ্কে গিজগিজ করা চিন্তাগুলো যে মানুষটার কপালের ভাঁজ হয়ে নতুন জীবনের জন্ম দিতে পারে, সেই সাধারণ পৃথিবীর অসাধারণ মানুষটাই হচ্ছেন শিক্ষক। যদিও বলতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত নই, পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন শিক্ষক হওয়া। সবাই শিক্ষক হতে পারে না, কেউ কেউ শিক্ষক হয়। কথাগুলো খুব সহজসরল বলে মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত বিষয়টি খুব জটিল ও গবেষণাযোগ্য।

মনে পড়ছে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথা। তিনি যত বড় না দার্শনিক ছিলেন, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক হিসাবে। অথচ খুব সাদামাটা একটা মানুষ। অসাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড় করালে এ সাধারণ মানুষটাকে হয়তো খুঁজেও পাওয়া যাবে না। উচ্চতাও তেমন মনে রাখার মতো কিছু না, খুব বিশ্রী রকমের মোটা একজন মানুষ। অতিমাত্রায় কুৎসিত একটা মানুষ! তার চোখগুলো দেখে মনে হতো, যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। নাকটাও ছিল বোঁচা।

কিন্তু এ মানুষটা এমন সব মৌলিক জ্ঞানের জন্ম দিয়েছেন, যা দীর্ঘ ২০০০ বছর ধরে পশ্চিমা সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। সক্রেটিস সারা পৃথিবীর শিক্ষক ছিলেন; অথচ তিনি বলতেন, নিজের ব্যাপারে আমি বলব-আমি এটাই জানি যে, আমি কিছুই জানি না। খুব অদ্ভুত এক আত্মবিশ্লেষণ, যেখানে জ্ঞানের মহাসমুদ্রে ডুবে থাকা মানুষটা বুঝতে পারছেন না, তিনিই জ্ঞানের মহাসমুদ্র হয়ে উঠেছেন। তার লেখা কোনো বই নেই; অথচ পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একাডেমিক দর্শনশাস্ত্রের মৌলিক বিষয় হিসাবে সক্রেটিস পড়ানো হয়। সবচেয়ে বড় কথা, তার চিন্তা কখনো থেমে থাকেনি; বরং তার চিন্তা ক্রমাগত শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সব যুগে, সব কালে প্রাসঙ্গিক হয়ে মানুষের মধ্যে নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দিয়ে চলেছে।

খুব অদ্ভুত ছিল তার শিক্ষাপদ্ধতি। আধুনিক যুগের মতো দামি দামি ইট-পাথরের শক্ত গাঁথুনিতে গড়া শিক্ষায়তনে বসে তিনি শিক্ষাদান করেননি; অথচ তিনি তখনও শিক্ষক ছিলেন, মৃত্যুর পরও তিনি শিক্ষক হিসাবেই বেঁচে আছেন। আধুনিক পৃথিবীর চার দেওয়ালের বন্দিত্বের মধ্যে আবদ্ধ শিক্ষায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। শিক্ষাগ্রহণের জন্য কোনো ছাত্র তার কাছে কখনো আসতেন না; বরং তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই জন্ম হতো ছাত্রদের। যেখানেই যাকে পেতেন, তাকেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর বোঝানোর চেষ্টা করতেন। সে চেষ্টায় কোনো ক্লান্তি ছিল না, জড়তা ছিল না, স্বার্থের অসুখ ছিল না। শিক্ষক তো এমনই হবেন, মানুষের চোখে তাকে হয়তো কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না; কিন্তু তার মধ্যে নিভৃতে বাস করা দার্শনিকটা ছড়িয়ে থাকবেন মানুষের চারপাশে।

মনে পড়ছে বিজ্ঞানী উইলহেলম সমারফিল্ডের কথা। গণিতবিদ মরিস ক্লাইন সমারফিল্ড প্রসঙ্গে বলতেন, ‘তিনি ছিলেন তড়িৎচৌম্বকীয় তত্ত্ব, রিলেটিভিটি এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের দিকনির্দেশক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যিনি এ শতকের প্রায় ত্রিশ বছরে আগত কালজয়ী সব পদার্থবিদদের গুরু।’ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ম্যাক্স বর্ন সমারফিল্ডের মেধাবীদের সুপ্ত প্রতিভা বের করে আনার বিষয়ে বলতেন, ‘তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা সব সময়ই তরুণদের আকৃষ্ট করে। এই আগ্রহী তরুণদের কিভাবে শেখাতে হবে, তা খুব ভালোভাবেই সমারফিল্ড জানতেন। তিনি প্রথমত তাদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতেন এবং ক্রমান্বয়ে তাদের দুর্বলতাগুলো দূর করে পরিষ্কার ধারণা প্রদান করতেন। শত ব্যস্ততা, যেমন-তার নিজের কাজ এবং গবেষণার মাঝেও তিনি তার ছাত্রদের জন্য সময় বের করতেন।’ ভাবা যায়, কত বড়মাপের মানুষ ছিলেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি যত বড় না বিজ্ঞানী ছিলেন, এর চেয়েও তার বড় পরিচয় ছিল শিক্ষক হিসাবে। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তিনি ছাত্রদের গড়েছেন, ত্যাগের পর ত্যাগ করে গেছেন; অথচ সে ত্যাগের মূল্য কখনো হাত পেতে নেননি। নিজের চোখের সামনে নিজের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন হতে দেখেছেন বারবার, আশাহত হয়েছেন, আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন; কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননি। নিজে যে স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি, সে স্বপ্ন পূরণে ছাত্রদের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়েছেন। রাতদিন সবকিছুকে তুচ্ছ করে ছাত্রদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

বিজ্ঞানী উইলহেলম সমারফিল্ড নিজে ৮৪ বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও বারবার তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। হয়তো তিনি ব্যর্থ হননি; বরং যারা তার মতো মানুষকে সে সময় সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেননি, তারাই ব্যর্থ হয়েছেন। পৃথিবীটা এমনই, যখন কোনো মানুষ তার প্রতিভার গুণে অনেক বড় হয়ে উঠতে থাকে, তখন স্বার্থপর মানুষ তাকে টেনে নামানোর নগ্ন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। তবে সমারফিল্ড কখনো হাল ছাড়েননি। নিজের সঙ্গে নিজে একাই লড়েছেন, তারপর আবার নতুন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। পথ বদলেছেন কিন্তু নিজে কখনো বদলে যাননি। তার সে ব্যর্থতা সফল হয়েছে যখন তার চারজন ছাত্র নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু কোনো ধরনের ঈর্ষা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ-তিনি জানতেন, ছাত্ররা যখন তার শিক্ষককে অতিক্রম করে যায়, তখন শিক্ষকের জন্য সেটা গৌরবের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীতে একজন সফল ছাত্রের শিক্ষক হওয়ার মতো আনন্দের আর কিছু হতে পারে না। খুব অদ্ভুত এক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয় এখানে। এমন মনস্তত্ত্বই তৈরি হওয়া দরকার, যেখানে নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থাকবেন একজন দার্শনিক, যিনি নিজে জানবেন তিনি দার্শনিক নন, তিনি শিক্ষক নন; অথচ তিনি এমন একজন সাধারণ মানুষ, যিনি অসাধারণ মানুষ গড়তে পারেন।

মনে পড়ছে বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের কথা, যিনি ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে গবেষণায় ডুবে থাকতে ভালোবাসতেন। গবেষণা করার সময় ছাত্ররা তাকে ঘিরে থাকত। ছাত্রদের গবেষণা শেখাবেন বলে বিয়ে করে সংসার পর্যন্ত করেননি তিনি। খুব ভাগ্যবান একজন মানুষ ছিলেন। ছাত্রদের গবেষণা শেখাতে শেখাতে এক প্রিয় ছাত্রের বুকে মাথা রেখে কখন যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তা কেউ বুঝতেও পারেনি। এমন ভাগ্য নিয়ে আমরা জন্মেছি কিনা জানি না, তবে এমন ভাগ্য নিয়ে যেন আমাদের শিক্ষার সব স্তরে শিক্ষকরা জন্ম নেন। আরেকজন ছাত্রবান্ধব শিক্ষকের কথা মনে পড়ছে। আমাদের জাতীয় বীর তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক শহিদ শামসুজ্জোহা স্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্বে থাকাকালে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনি প্রাণ দেন। প্রাণের ছাত্রদের আগলে রেখে তিনি নিজের বুক পেতে পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে চিৎকার করে বলেন ‘আমি বলছি গুলিবর্ষণ হবে না। আর যদি গুলি করা হয়, তবে কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে তা আমার গায়ে লাগবে।’ সাহসী মানুষটি কথাগুলো বলে পিছপা হলেন না। কারণ-এগুলো কথার কথা ছিল না; বরং অন্তর দিয়ে ভালোবাসার মুখগুলোকে আঁকড়ে ধরার আকুতি ছিল। গুলি চালাল পাকিস্তানি হানাদাররা। ছাত্রদের নিরাপদ রাখতে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। রক্ত ঝরল মাটিতে। শহিদের রক্ত। নিভে গেল আলোকিত একজন মানুষের জীবন। নিজের জীবন তুচ্ছ ভেবেছেন সন্তানতুল্য ছাত্রদের জন্য। এমন শিক্ষক কি এখন আর আছে, যিনি পরিবারের কথা ভাবেননি, নিজের স্বার্থের কথা ভাবেননি, সব সময় ভেবেছেন ছাত্রদের কল্যাণের কথা। মৃত্যু মানুষটির প্রাণ কেড়ে নিলেও, কেড়ে নিতে পারেনি তার কালজয়ী সত্তাকে। ইতিহাস এই মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষটিকে গড়েনি; বরং তিনিই ইতিহাসকে গড়েছেন।

প্রতিদিন এমন নিঃস্বার্থ শিক্ষক খুঁজি। সেই প্রাণপ্রিয় মুখগুলোকে খুঁজি। কিন্তু কোথায় তারা? তারা তো আকাশের তারা হয়ে গেছেন। সে তারা এখনো রাতে আলোর মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের আলোকিত পথ দেখানোর অপেক্ষা করে। কিন্তু আমরা তো স্বার্থপর হয়ে গেছি। সবাই আর শিক্ষক নেই, কেউ কেউ শিক্ষক। এক দুষ্টচক্রে বাধা পড়ে গেছে শিক্ষকদের প্রকৃত সত্তা। শিক্ষকতা পেশা নয়, এটা একটা আত্মত্যাগ, এটা একটা সেবা। কিন্তু কে শুনবে কার কথা। ছাত্রদের মুখগুলো দেখে কষ্ট লাগে। ওরা ওদের প্রতিভার আলো ছড়িয়ে আলোকিত হতে চায়। কিন্তু শিক্ষক নামের সেই নিঃস্বার্থ মানুষটা তো আর নেই। সব যেন দুঃস্বপ্ন, সব যেন গন্তব্যহীন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments