Friday, June 18, 2021
Home জাতীয় প্রতি বছর বিপুল বিনিয়োগেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়নো যাচ্ছে না সেচের পরিধি

প্রতি বছর বিপুল বিনিয়োগেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়নো যাচ্ছে না সেচের পরিধি

আ.জা. ডেক্স:

বছর বছর বিপুল অংকের বিনিয়োগ করেও সরকার কাক্সিক্ষত মাত্রায় সেচের পরিধি বাড়াতে পারছে না। তাতে কৃষি উৎপাদনশীলতায় ছেদ পড়ছে। ফলে শস্য খাতে নিম্নগামী প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। দেশে আবাদের জন্য সেচযোগ্য জমি রয়েছে ৭৭ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর। তার মধ্যে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত সেচের আওতায় এসেছে ৫৬ লাখ হেক্টর। এখনো সেচ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে ২৭ শতাংশ বা প্রায় ২১ লাখ হেক্টর জমি। তাছাড়া দেশের কৃষকরা সেচের পানির দক্ষ ব্যবহারও করতে পারছে না। বরং সেচকাজে ব্যবহার হওয়া ৬০ শতাংশ পানিই অপচয় হচ্ছে। ফলে বিপুল পরিমাণ জমি সেচ সুবিধার বাইরে থাকার পাশাপাশি সেচকাজে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সেচ খাতে প্রতি বছর মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছে সরকার। তবে মাঠ পর্যায়ে তার খুব একটা প্রভাব পড়ছে না। বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৩১৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছর ২৮৩ কোটি ৩৬ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ২১৫ কোটি ৫৪ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৪৩৯ কোটি ৩০ লাখ ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ৪৮৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সেচ খাতে খরচ করা হয়। সব মিলিয়ে গত ৫ বছরে সেচ সম্প্রসারণে সরকারি বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকারও বেশি। তার বিপরীতে সেচ সুবিধার আওতায় এসেছে মোটে এক লাখ হেক্টর জমি। যা ৫৪ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৫ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর। ওসব জমি আবাদে ব্যবহৃত হয়েছে ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪১৩টি সেচযন্ত্র। তার মধ্যে শ্যালো টিউবওয়েল ছিল ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৫৩২টি, শ্যালোর বাইরে সেচে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৩৭ হাজার ৬৩৪টি গভীর নলকূপ ও ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৮টি লো লিফট পাম্প। মূলত দেশ ভাগের পর পরই সেচকাজে যান্ত্রিকীকরণের শুরু। পাম্পের সাহায্যে হাওড়-বাঁওড়, খাল-বিল কিংবা নদীর পানি ফসলি জমিতে ব্যবহার তখন থেকেই কৃষকরা শুরু। স্বাধীনতার পর নলকূপ আর গভীর নলকূপে বাংলাদেশের সেচ কার্যক্রম আরো গতি পায়। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে পা রাখতে চললেও দেশের বিপুলসংখ্যক সেচযোগ্য জমি এখনো সেচ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, সরকারি বিনিয়োগের বিপরীতে সেচ সুবিধায় আসা জমির পরিমাণ বাড়ছে না। শস্য উৎপাদনে তার নেতিবাচক পড়ছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই শস্য খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্তপ্রবণ এলাকা, চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমের চরাঞ্চলে সেচ সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। বেশকিছু বিভাগে ব্যাপক হারে আবাদি জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কিছু এলাকায় পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। দেশের সেচ কার্যক্রমে এমন গতিহীন ভাব বজায় থাকলে সামনের দিনে কৃষির উন্নয়ন মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) দেশের সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারণে এককভাবে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। বিগত ১৯৬৭-৬৮ সালে বিএডিসি গভীর নলকূপ স্থাপন করে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু করে এবং ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে অগভীর নলকূপ স্থাপন শুরু করে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার নির্মাণের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ও ভূ-উপরিভাগের পানির সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। রাবার ড্যাম (চলমান), হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম (চলমান), সৌর শক্তিচালিত সেচপাম্প স্থাপন, সেচযন্ত্রে স্মার্ট বেজড প্রিপেইড মিটার স্থাপন ও ডাগওয়েলসহ টেকসই সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করছে। আধুনিক ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ড্রিপ ইরিগেশন ও স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশনের মতো লাগসই প্রযুক্তি ও ভ্রাম্যমাণ সেচপাম্প চালু করতে কার্যক্রমও চালু করেছে।

এদিকে বাংলাদেশের সেচ খাত প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ জানান, কী কারণে সব অঞ্চলে সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। আবার সেচ সম্প্রসারণ করলে পরিবেশগত ও আর্থিকভাবে কতটুকু লাভবান হওয়া সম্ভব তাও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে সেচযোগ্য জমিতে যদি সেচ সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব না হয় তাহলে তা কৃষির জন্য বড় ক্ষতিকর। এর ফলে একদিকে শস্য বা কৃষি খাতের উৎপাদন যেমন হারাচ্ছে, তেমনি কৃষকের আর্থিক সুবিধা দিতেও ব্যর্থ হচ্ছে। হয়তো এর মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের একটি বড় অংশকে আর্থিক সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে। তাই সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে একটি বড় ধরনের ধাক্কা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আগের পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে ভর্তুকি সুবিধা আরো বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে সেচ প্রসঙ্গে বিএডিসির ক্ষুদ্রসেচ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. জিয়াউল হক জানান, কয়েক বছর ধরে সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেচ ব্যবস্থাপনায় জোর দেয়া হয়েছে। ফলে সেচের আওতা এখন আর জ্যামিতিক হারে নয়, গাণিতিক হারে বাড়ছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর ভারসাম্য রক্ষা করেই একটি টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনায় জোর দেয়া হচ্ছে। আবার কয়েকটি বিশেষ অঞ্চলে সেচের কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। ওসব অঞ্চলে ঢালাওভাবে কার্যক্রম নিয়ে সেচের আওতা বাড়ানো সম্ভব হবে না। অঞ্চলগুলোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই সেচের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আলাদা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। চরাঞ্চলের ভাসমান সেচযন্ত্র দিয়ে নতুনভাবে জমিকে সেচের আওতায় আনা হচ্ছে। ডাগওয়েল বা ফিতা পাইপের মাধ্যমে দূরের জমিগুলোতে পানি নেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেচের পানির অপচয় কমানো ও ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা, সংরক্ষণ ও নিষ্কাশনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বেশি পরিমাণে খাল-নালা খনন ও পুনঃখনন করা হচ্ছে। ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহার করে সেচকৃত জমির পরিমাণ ৬০ লাখ হেক্টরে উন্নীত করতে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

জামালপুরে আরো ৭৭৫ পরিবার পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ‘পাকা ঘর’

হাফিজুর রহমান: জেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীন (২য় পর্যায়) ৭৭৫টি পরিবারকে ০২ শতাংশ জমিসহ ঘরের মালিকানা হস্তান্তরের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি...

প্রয়াত সাংবাদিক আনোয়ারের পরিবারকে আর্থিক অনুদান দিলেন জামালপুরের ডিসি মোর্শেদা জামান

স্টাফ রিপোর্টার: জামালপুরে প্রয়াত সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন আনু’র পরিবারের কাছে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দিলেন জামালপুরের সুযোগ্য মানবিক জেলা...

জামালপুরে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলোর যোগসুত্র স্থাপন বিষয়ক সভা

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের মূল ¯্রােতধারায় নিয়ে আসার অঙ্গীকার সামনে রেখে বুধবার জামালপুরে সমমনা সংগঠনগুলোর...

জাতীয় মহিলা সংস্থার জামালপুরের চেয়ারম্যান হলেন আঞ্জুমনোয়ারা হেনা

নিজস্ব সংবাদদাতা: জামালপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঝাউগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আঞ্জুমনোয়ারা বেগম হেনাকে চেয়ারম্যান মনোনীত করে...

Recent Comments