Friday, June 25, 2021
Home জাতীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেল ৭০ হাজার পরিবার

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেল ৭০ হাজার পরিবার

আ.জা. ডেক্স:

ভূমিহীন-গৃহহীনদের একটি সুন্দর ঘরের স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপে প্রায় ৭০ হাজার পরিবার পেলো একটি আধাপাকা বাড়ি। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে এসব ঘর ও জমি দেওয়া হয়। এক সঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে বিনামূল্যে ঘর করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বে অন্যন্য নজির সৃষ্টির করলো বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘর বিতরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন টানা তিন বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে মুজিববর্ষ ঘোষণা করে সরকার। মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না- এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আশ্রায়ন-২ প্রকল্পের অধীনে চলমান কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে সারাদেশে ঘর পেলো ৬৯ হাজার ৯০৪ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার।

দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর করে দিতে এখন পর্যন্ত প্রায় নয় লাখ পরিবারকে তালিকাভূক্ত করেছে শেখ হাসিনা সরকার। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে খুলনা, নীলফামারী, হবিগঞ্জ ও চাপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে ঘর পাওয়া পারভীন নামে এক নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করে এবং সুস্থতা কামনা করেন। নিজের স্বামী নিয়মিত কাজ পায় না এবং খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটে জানিয়ে পারভীন ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আমার স্বামী কাজ পায় না। মাঝে-মধ্যে না খেয়ে থাকতে হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। কোনদিন ভাবিনি ঘর হবে। আপনি আমাদের ঘর দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন। আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন। কয়েকটি বাক্য বলেই উপকারভোগী নারী কৃতজ্ঞতায় কাঁদতে থাকেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে সান্তনা দিয়ে বলেন, আপনি কাঁদবেন না। আমি মনে করি এটা আমার কর্তব্য। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির পিতা কন্যা হিসেবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো, এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার স্বপ্ন পূরণ করবো। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে সে জন্য আমি আমার জীবনকে উৎসর্গ করেছি। বাংলাদেশে একটি মানুষও যেন গৃহহীন ও ভূমিহীন না থাকে আমি সেই ব্যবস্থা করবো। সেই সঙ্গে আপনারা যেন আপনাদের জীবন-জীবিকার পথ খুঁজে পান সেই ব্যবস্থাও করবো। সারাদেশে যারা ঘর পেয়েছেন তাদের ঘরের সামনে একটি করে গাছ, বিশেষ করে ফলজ গাছ লাগানোর আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী। নদী ভাঙনে যাতে আর কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজকে সত্যি আমার জন্য একটি আনন্দের দিন। কারণ এ দেশের যারা সব থেকে বঞ্চিত মানুষ, যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, ঘর-বাড়ি নেই। আজকে তাদের অন্তত একটা ঠিকানা, মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পেরেছি। এক সঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঘর দেওয়ার নজির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি না পৃথিবীর কোনো দেশে কখনো অথবা আমাদের দেশে কোনো সরকার এত দ্রুত এতগুলো ঘর করেছে। … এই ঘরগুলো তৈরি করা সহজ কথা নয়। সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় পুর্নব্যক্ত করে টানা তিনবারের সরকার প্রধান বলেন, মুজিববর্ষে একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। আমরা সবার জন্য ঠিকানা করে দেবো, সবাইকে ঘর করে দেবো। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যেন সুন্দর ভাবে বসবাস করতে পারে সেটাই আমার লক্ষ্য। করোনা মহামারির কারণে নিজের হাতে এসব ঘরের দলিল হস্তান্তর করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একান্ত ভাবে ইচ্ছে ছিল নিজের হাতে ঘরের দলিল আপনাদের হাতে তুলে দেবো। করোনার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। আমরা ডিজিটালি হস্তান্তর করছি। ভ‚মিহীন-গৃহহীনদের ঘর করে দিতে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী।

৬৯ হাজার ৯০৪ পরিবারের মধ্যে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভ‚মিহীন-গৃহহীন পরিবারকে দুই শতাংশ খাস জমির মালিকানা দিয়ে বিনা পয়সায় দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে ব্যারাকের মাধ্যমে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪ প্রকল্পের মাধ্যমে তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এটিই বিশ্বে গৃহহীন মানুষকে বিনামূল্যে ঘর করে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে নতুন ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ। দেশে ভ‚মিহীন ও গৃহহীন অসহায় মানুষদের মধ্যে যাদের ভ‚মি নেই তাদের সরকারের খাস জমি থেকে দুই শতাংশ ভিটে এবং ঘর দিচ্ছে সরকার। যাদের ভিটে আছে ঘর নেই তাদের ঘর দিচ্ছে সরকার। প্রতিটি ঘর দুই কক্ষ বিশিষ্ট। এতে দুটি রুম ছাড়াও সামনে একটি বারান্দা, একটি টয়লেট, একটি রান্নাঘর এবং একটি খোলা জায়গা থাকবে। পুরো ঘরটি নির্মাণের জন্য খরচ হবে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং মালামাল পরিবহনের জন্য চার হাজার টাকা দেওয়া হবে প্রতি পরিবারকে।

সরেজমিনে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, যারা প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পাচ্ছেন তাদের চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তারা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ইশ্বরিপুর ইউনিয়নের স্বামী পরিত্যক্তা মর্জিনা বেগম বলেন, এক মেয়ে নিয়ে বাঁশের কঞ্চির বেড়ার ঝুপড়িতে থাকি। দিন মজুর খেটে কোনো রকমে জীবন চলছে। নিজের একটা ঘর হবে কোনোদিন ভাবিনি। প্রধানমন্ত্রীকে দোয়া করি। তিনি আমাদের ঘর দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন। সাতক্ষীরা সদরের দিনমজুর অরবিন্দ গাইন বলেন, আগে সরকারি খাস জমিতে খড়ের চালার ঘরে থাকতাম। নিজের ঠিকানা ছিল না। শেখের বেটি আমাদের ঘর ও জমি দিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন বলেন, সারা দুনিয়াতে এটি প্রথম ঘটনা এবং একমাত্র ঘটনা একসঙ্গে বিনে পয়সায় এত ঘর করে দেওয়া। মাদার অব হিউম্যানিটি সারা দুনিয়াতে একটি নজির স্থাপন করলেন। ২৩ জানুয়ারি প্রায় ৭০ হাজার পরিবারকে ঘর দেওয়ার পর থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে আরও এক লাখ ঘর নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে বলেও জানান মাহবুব হোসনে। সারা বাংলাদেশে ঘরও নেই, জমিও নেই এমন পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৯৩ হাজার ৩৬১। ভিটেমাটি আছে, ঘর জরাজীর্ণ কিংবা ঘর নেই এমন পরিবারের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৯২ হাজার ২৬১। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারা বাংলাদেশে যে তালিকা করা হয়েছে সব মিলিয়ে সেই তালিকায় আট লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবার রয়েছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের নথি থেকে জানা যায়, ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে আশ্রয়ণ নামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ সাল থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাস অবধি তিন লাখ ২০ হাজার ৫২টি ভ‚মিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচিকে অনুসরণ করে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার ঘরে ফেরা কর্মসূচি, গৃহায়ন কর্মসূচি শুরু করে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো- ভ‚মিহীন, গৃহহীন, ছিন্ন অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, ঋণপ্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা এবং আয় বাড়ে এমন কার্যক্রম সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ। এর আগে গত ২৩ জুলাই কক্সবাজার জেলায় জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয়কেন্দ্র খুরুশকুল আশ্রায়ণ প্রকল্পের প্রথম ধাপে নির্মিত ২০টি ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে প্রথম ধাপে উদ্বোধন হওয়া ভবনগুলোতে ফ্ল্যাট পেয়েছেন ৬০০টি পরিবার। ১০০১ টাকা নামমাত্র মূল্যে এসব ফ্ল্যাট হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম ধাপে নির্মিত ৫ তলা ২০টি ভবনসহ প্রকল্পের মোট ১৩৯টি ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে থাকছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট। খুরুশকুল প্রকল্পের সবগুলো ভবন নির্মিত হলে উদ্বাস্তু জীবনের অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশ ছেড়ে সাজানো পরিপাটি দালানে উঠবেন মোট প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার। খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে ২৫৩ একর জমির উপর গড়ে ওঠা এ বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পকে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয়কেন্দ্র বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

জামালপুরে আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত

জামালপুর প্রতিনিধি: “সংকটে, সংগ্রামে ও অর্জনে গণমানুষের পাশে আওয়ামী লীগ” এই প্রতিপাদ্যের আলোকে নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে জামালপুরে বাংলাদেশ আওয়ামী...

শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

নিজস্ব সংবাদদাতা: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলাল এমপি বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেদিন দেশে ফিরে এসেছিলেন বলেই...

দেওয়ানগঞ্জের শারীরিক প্রতিবন্ধী শাহিদা আক্তারকে ২০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান

নিজস্ব সংবাদদাতা: জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর আমখাওয়া ইউনিয়নের সানন্দবাড়ী বাজার এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী শাহিদা আক্তারকে ২০ হাজার টাকা...

ইসলামপুরে স্বাস্থ্য বিভাগের বার্ষিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

ওসমান হারুনী: জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের বার্ষিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মিলনায়তনে উন্নয়ন সংঘ...

Recent Comments