Sunday, June 13, 2021
Home জাতীয় বন্ড কমিশনারেটে নিবন্ধিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত

বন্ড কমিশনারেটে নিবন্ধিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত

আ.জা. ডেক্স:

ঢাকা বন্ড কমিশনারেটের আওতায় সাড়ে ৬ হাজারের বেশি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের ৭০ ভাগেরও বেশি চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত। মূলত দু’ভাবে বন্ডের পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রথমত, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ড লাইসেন্স খুলে পণ্য আমদানি করে এবং দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। মূলত অসাধু ব্যবসায়ীরা আমদানি প্রাপ্যতা নির্ধারণ পদ্ধতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এসব অপকর্ম চালাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের রফতানি আদেশ যৎসামান্য থাকলেও কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শুধু মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী প্রাপ্যতা নির্ধারণ করিয়ে নিচ্ছে। আর এভাবে আমদানি করা অতিরিক্ত কাঁচামাল তারা খোলাবাজারে বিক্রি করছে। ঢাকা বন্ড কমিশনারেট সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কালোবাজারে শুল্কমুক্ত পণ্য বিক্রির সঙ্গে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই জড়িত। ওই চক্রটি বন্ডের কাপড় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে খালাস হয়ে ঢাকার আশপাশের পাইকারি বাজারে নিয়ে যায়। রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়, চিটাগাং রোড, কাঁচপুর এলাকায় কাপড়বোঝাই গাড়ি আনলোড হয়। সেজন্য চিটাগাং রোডের অনেক বাসা-বাড়িতে অস্থায়ী গোডাউনও গড়ে উঠেছে। ওসব গোপন গোডাউন থেকে সুবিধামতো সময়ে কাপড় হাতবদল হয়। নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে সুতা, পুরান ঢাকার ইসলামপুরে বন্ডের কাপড়, নয়াবাজারে কাগজ ও উর্দু রোডে পিপি দানা বিক্রি হয়। মাঝেমধ্যে দু-একটি চালান বন্ড কর্মকর্তাদের অভিযানে ধরা পড়লেও বেশির ভাগই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অস্তিত্বহীন ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স বাতিল করেছে। নামসর্বস্ব ওসব প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় মালামাল এনে পুনঃরফতানি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েকশ’ কোটি টাকা। অডিটের জন্য কাস্টমস কর্মকর্তারা সরেজমিন কারখানা পরিদর্শনে গেলে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। এমন ধরনের আরো ৩৬২টি প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলোরও লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বর্তমানে ওসব প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ও দায়দেনা নিরূপণের কাজ চলছে। আগামী ১ মাসের মধ্যে ৯২টির লাইসেন্স বাতিল করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।

সূত্র আরো জানায়, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের মতে, বন্ডের লাইসেন্স প্রক্রিয়ার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। কারণ সৎ ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স চেয়েও পায় না। আর লাইসেন্স পেতে ক্ষেত্রবিশেষে কারো কারোর দুই মাস সময়ও লেগে যায়। আবার কারো কয়েক বছর লাগে। মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কে কীভাবে ম্যানেজ করছে তার ওপর এটা নির্ভর করে। অসৎ ব্যবসায়ীদের একটি লাইসেন্স বন্ধ করলে কয়েকদিন পরই অন্য নামে লাইসেন্স নিয়ে আবারো ব্যবসা শুরু করে। লাইসেন্স প্রক্রিয়াতেই সব গলদ। লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য কয়েকটি বিষয়ে দেখা হয়। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সরেজমিন কারখানা পরিদর্শন। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতেই লাইসেন্স দেয়া হয়। সরেজমিন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ, কাঁচামালের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় যাচাই-বাছাই করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লাইসেন্স দেয়া হয়। ওই রিপোর্ট যারা দিয়ে থাকে তারা অনেক সময়ই টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন না গিয়েই রিপোর্ট জমা দেয়। আর গেলেও নামকাওয়াস্তে পরিদর্শন করে ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিত্তিতে রিপোর্ট জমা দেয়। বর্তমানে বন্ড কমিশনারেটের আওতায় ৬ হাজার ৬৮৪টি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মধ্যে নানা অনিয়মে জড়িত থাকায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৫০৩টির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। সর্বমোট ৩ হাজার ৬৪০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত রয়েছে। আর স্থগিত থাকা ৩৬২টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ নিরীক্ষা ও দায়দেনা নিরূপণের কাজ চলছে। আগামী ১ মাসের মধ্যে ৯২টি লাইসেন্স বাতিল করার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। আর ৩ বছরের বেশি সময় অডিট করেনি ৭১৪টি প্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে ওসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন) লক করা হয়েছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের অক্টোবর পর্যন্ত বন্ড কমিশনারেট এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। গত বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৯৫১ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর মাসওয়ারি ভিত্তিতে অক্টোবরে আদায় হয়েছে ৩৯৫ কোটি টাকা। অক্টোবরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৭৮ কোটি টাকা। তাছাড়া সুপ্রিমকোর্টেন আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ, আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও সার্টিফিকেট মামলা রয়েছে ৪৫৬টি। ওসব মামলায় জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। ওই মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাজস্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩০টি মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে। ওসব মামলায় এক হাজার ৩৫৭ কোটি টাকার রাজস্ব জড়িত। সেগুলো আদালতের অনুমতিক্রমে কজলিস্টে অন্তর্ভুক্ত শুনানির উদ্যোগ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে পাঠানো হয়েছে। সার্টিফিকেট মামলা নিয়মিতভাবে তদারকির মাধ্যমে নিষ্পত্তি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।

অন্যদিকে সম্প্রতি ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে একটি প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে রাজস্ব আদায়ের চিত্র, বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য, অডিট সম্পর্কিত তথ্য, হোম কনজাম্পশন সম্পর্কিত তথ্য, রাজস্ব বকেয়ার তথ্য, মামলা সম্পর্কিত তথ্য, প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম, সংস্কার কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া বন্ড অপব্যবহার বন্ধে ৪ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে এক্সপোর্ট জেনারেল মেনিফেস্টো চালু করা; ইপিজেডগুলোতে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করা; বিজিএমইএ’র দেয়া ইউডির (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) সংশোধনী অনলাইনে প্রেরণের বাধ্যবাধ্যতা আরোপ এবং বন্ড কমিশনারেটকে ভেঙে অঞ্চলভিত্তিক ২টি বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠা করা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন জানান, যেসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি সেগুলোর আমদানির তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। ওসব প্রতিষ্ঠান কবে বন্ধ হয়েছে, বন্ধ হওয়ার পর কাঁচামাল আমদানি করেছে কিনা, নাকি শুধু কাগজে-কলমে কারখানা খুলে বন্ডের আওতায় মালামাল আমদানি করেছে- সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে যদি দেখা যায় কারখানা বন্ধ থাকার পরও মালামাল আমদানি হয়েছে, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে মামলা করা উচিত। আর যদি কাগজে-কলমে কারখানা হয়, তাহলে ওই কারখানার লাইসেন্স দেয়ার সময় কমিটিতে যেসব কর্মকর্তা ছিলেন বা যাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার শওকত হোসেন জানান, বন্ড ফাঁকিবাজদের কোনো প্রকার ছাড় নেই। যারা এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তারা যতো শক্তিশালীই হোক না কেন, প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কর্মকর্তাদের অডিট নবায়নের জন্য সব প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতেও অভিযান চালানো হচ্ছে। তাছাড়া বন্ড অপব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি বকেয়া পাওনা আদায়েরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানই সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব না দিতে গড়িমসি করছে। অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। ওসব মামলা শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

৬ দফার ভেতরেই নিহিত ছিল স্বাধীনতার এক দফা: প্রধানমন্ত্রী

আ.জা. ডেক্স: ঐতিহাসিক ৬ দফার ভেতরেই স্বাধীনতার এক দফা নিহিত ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির...

স্বাস্থ্যবিধি মেনে নেয়া হবে এসএসসি পরীক্ষা: শিক্ষাবোর্ড

আ.জা. ডেক্স: চলমান করোনাভাইরাসের মহামারী পরিস্থিতিতে সব কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে...

১৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট পাস

আ.জা. ডেক্স: চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ১৩ হাজার ৯৮৭ কোটি ২৭ লাখ ৩২ হাজার টাকার সম্পূরক বাজেট সংসদে...

করোনায় আরও ৩০ মৃত্যু, শনাক্ত ১৯৭০

আ.জা. ডেক্স: করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ১৯...

Recent Comments