Wednesday, October 20, 2021
Home জামালপুর বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে চলবেনা ফেরি: ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনার ভবিষ্যত কি?

বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে চলবেনা ফেরি: ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনার ভবিষ্যত কি?

শুভ্র মেহেদী:

বৃটিশ আমল থেকে রেলওয়ে ফেরিসহ মানুষ পারাপারের জন্য বেশ সুপরিচিত ছিলো জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাটটি। কিন্ত ২০০১ সালে ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে ঐহিত্যবাহী ঘাটটি। বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর চাপ কমাতে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই পথে আবারো ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয় বিআইডবিøটিএ। ইতিমধ্যে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ও গাইবন্ধার বালাসী দুই প্রান্তে ঘাটের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেছে। সবশেষ হবার পর এখন নাব্যতা সংকট দেখিয়ে এপথে ফেরি চলাচল সম্ভব নয় বলছে বিআইডবিøটিএর কারিগরি কমিটি। আর এমন সিদ্ধান্তে ফিকে হয়ে যাচ্ছে দুই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

ঢাকার সাথে দেশের উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৯৩৮ সালে বৃটিশ সরকার জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদঘাট এবং গাইবন্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ ঘাটে যমুনা নদীতে রেল ফেরি সার্ভিস চালু করে। সে সময় বৃহত্তম ময়মনসিংহের জেলাগুলো ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে উত্তরাঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁয়ে অল্প সময়ে এবং কম খরচে যাত্রী পারপার, কৃষিপণ্য, ডিজেল, সারসহ নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন করা হতো। ফেরিতে রেল গাড়ি পারাপারের জন্য কোলকাতাসহ বিভিন্ন দেশে সুপরিচিত ছিলো বাহাদুরাবাদঘাটের এই নৌপথটি। যমুনা নদীর নাব্যতা সংকটের কারনে ১৯৯০ সালে তিস্তামুখ ঘাটটি সরিয়ে বালাসীঘাটে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে ঐহিত্যবাহী ঘাটটি। সেই সাথে বেকার হয়ে পড়ে বাহাদুরাবাদ-বালাসী ঘাটকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করা কুলি, শ্রমিক, হোটেল ব্যবসায়ী, কর্মচারীসহ অসংখ্য মানুষ। বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে ফেরি চালাচল বন্ধ হয়ে গেলেও দীর্ঘ ২০ বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই অঞ্চরের হাজারো মানুষ প্রতিদিন নৌকায় পারাপার হচ্ছে। যমুনা নদীর ২৬ কিলোমিটার পথ নৌকায় পারাপার হতে গিয়ে এই দীর্ঘ ২০ বছরে ঘটেছে অসংখ্যা প্রাণহানীর ঘটনা। তাই এই পথে আবারো ফেরি সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন দুই অঞ্চরের মানুষেরা।

২০১৩ সালে তৎকালীন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান ঘাট পরির্দশনে এসে বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে আবারো ফেরি সার্ভিস চালু আশ্বাস দেন। দীর্ঘদিন ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার পর দুই অঞ্চলের মানুষের দাবি এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর চাপ কমাতে আবারো বাহাদুরাবাদ-বালাসী ঘাটে ফেরি সার্ভির চালুর উদ্যোগ নেয় বিআরডব্লিটিএ। ২০১৭ সালে ১২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরে উদ্যোগ নেয়া প্রকল্পটি পরবর্তীতে দুই দফা বাড়িয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ছিল জমি অধিগ্রহণ, পাকিং, ফেরিঘাট, অভ্যন্তরীণ রাস্তাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজ। এছাড়াও বাহাদুরাবাদ-বালাসীঘাট রুটে নদী ড্রেডিং অন্তভুক্ত ছিলো এই প্রকল্পে। চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয় এই প্রকল্পের কাজ। ফেরি রুট ড্রেজিং এর পর বিআইডব্লিউটিসির খালি ফেরি দুই দফা ট্রায়াল রান করতে গিয়ে নাব্যতা সংকটে আটকে যায়।

সম্প্রতি বিআরডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি দু’বার ঘাট পরিদর্শন করে। নদীর নাব্যতা সংকট, দুই ঘাটের মধ্যে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ দুরত্ব ফেরি চলাচলের জন্য অলাভজনক, ভুলস্থানে ঘাট নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি কারন দেখিয়ে বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটটি ফেরি চলাচলের উপযোগী নয় বলে জানিয়েছে ওই কারিগরি কমিটি। এই খবরে আবারো হতাশ হয়ে পড়েছেন দুই অঞ্চলের মানুষ, সেই সাথে ফিকে হয়ে যাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নও। স্থানীয় বাসিন্দা মদন মোহন ঘোষ এবং তারিক মাহমুদ অভিযোগ করেন, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাহাদুরাবাদ-বালাসী ঘাটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমরা চরমভাবে হতাশ হয়েছিলাম। আবারো ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগে দুই অঞ্চলের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছি। সবকিছু তৈরি হয়ে যাওয়ার পর এখন শুনছি নাব্যতা সংকট দেখিয়ে ফেরি চালু হবেনা। আসলে সঠিকভাবে নদী ড্রেজিং করাই হয়নি। ড্রেজিং করে উত্তোলিত বালু নদীতেই ফেলা হয়েছে, আর একারনেই নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে।

জামালপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ইউসুফ আলী জানান, বাহাদুরাবাদ-বালাসী ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগে দুই অঞ্চলের মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছিলো, কিন্তু ফেরি চালু না হওয়ার খবরে আবারো হতাশা দেখা দিয়েছে। সবকিছু তৈরী হয়ে যাওয়ার পর কেন তারা বলছেন ফেরি চলাচল সম্ভব নয়, আগে কেন এবিষয়ে সমিক্ষা করা হয়নি? সেই সাথে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো এবং কাজের ভবিষ্যত কি?

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.কে.এম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ নাব্যতা সংকটের কারনে ফেরি সার্ভিস এই মুহুর্তে চালু হচ্ছেনা স্বীকার করে বলেন, বাহাদুরাবাদ-বালাসী ফেরি চলাচলের উদ্যোগটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। দুই ঘাটের দুরত্ব কমিয়ে আনতে নদীর বিকল্প লিংক ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়রা প্রকল্পটি নিয়ে বেশি আবেগ প্রবণ হওয়ায় ড্রেজিং এর কারিগরি বিষয়ে কোন কিছু না জেনেই অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন।

সকল জটিলতা কাটিয়ে আবারো চালু হবে ফেরি চলাচল, প্রাণ ফিরে পাবে বাহাদুরাবাদ-বালাসী ঘাটের হারানো গৌরব, এমনটাই প্রত্যাশা এই দুই অঞ্চলের মানুষের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

পাকিস্তানসহ পাঁচ দেশকে আমন্ত্রণ জানালো ভারত

আ.জা. আন্তর্জাতিক: আফগানিস্তানে ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে ভারতের অস্বস্তি কাটছেই না। একদিকে তালেবানের ওপর পাকিস্তানের প্রভাব, অন্যদিকে আফগানিস্তানে দিল্লির...

কুয়েতে তেল শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ড

আ.জা. আন্তর্জাতিক: কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি জানিয়েছে, সোমবারের এ...

পতিতাবৃত্তি বন্ধ করতে চান স্পেনের প্রধানমন্ত্রী

আ.জা. আন্তর্জাতিক: আইন করে দেশে পতিতাবৃত্তি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ। রোববার তার দল সোস্যালিস্ট...

২০০ নারী-পুরুষের পোশাকহীন ফটোশ্যুট

আ.জা. আন্তর্জাতিক: স্পেন্সার টিউনিক প্রথম মৃত সাগরে তার লেন্স স্থাপন করার ১০ বছর পর বিশ্বখ্যাত এই আলোকচিত্রী আরেকবার...

Recent Comments