Saturday, February 4, 2023
Homeজামালপুরবিনাচিকিৎসায় ভোগছেন ডাবল মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দম্পতিমোহাম্মদ আলী

বিনাচিকিৎসায় ভোগছেন ডাবল মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দম্পতিমোহাম্মদ আলী

মোহাম্মদ আলী: দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে জীবন যৌবনের স্বর্বস্ব বিলিয়েছি। দুইবার মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ করেছি। জেল জুলুম নির্যাতন সয়েছি। জীবনের শিক্ষা দীক্ষা কোনো কাজে লাগাতে পারিনি। নির্যাতনের ক্ষত শোকাতে গিয়ে বাবার সম্পদ শেষ করেছি। যোগ্যতা থাকতেও নিজের কথা ভবিষ্যতের কথা ভাবিনি। ভেবেছি দেশ ও দেশের মানুষের কথা। আজ সংসার জীবনে আমার থাকার একটা ঘর পর্যন্ত করতে নেই । স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকি ভাইয়ের ঘরে। জীবন সায়াহ্নে এসে নানা রোগ শোকে ঘর বেঁধেছে দেহে। চোখের সামনে বিনাচিকিৎসায় মরতে বসেছে কিডনি রোগে আক্রান্ত স্ত্রী। বাড়ীর ভিটা ব্যাংকে রেখে যে পরিমাণ ঋণ করেছিলাম তাও ব্যয় হয়ে গেছে চিকিৎসায়। এখন আরও টাকার দরকার নিজের ও স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। কিন্ত, কোথায় পাব ? কার কাছে চাইব? কে শুনবে আমার আকুতি? ? সারাজীবন দেশকে দেশের মানুষকে দিয়েছি। এখন চাই কি করে?জীবন সংগ্রামী এক যুদ্ধার মানবিকতার ডাকে সারা দিবে কোন মহামানব?
বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে একজন বিজয়ী বীর যোদ্ধা কেমন আছেন? জানতে চাইলে অশ্রুসিক্ত নয়নে উপরে কথাগুলো বলেছেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর অত্যান্ত স্নেহভাজন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইদ এমপি, বর্তমান এমপি দিপঙ্কর তালুকদার রাজা, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও এমপি এম সুলতান মুহাম্মদ মুন্সুর, এমপি মানু মজুদার ও সাবেক এমপি নাসিম উসমান এবং শেখ মারুফের সহযোদ্ধা, জামালপুর জেলার বকশিগঞ্জ নিবাসী, মুজিবপাগল, বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিমল চন্দ্র সাহা (৬০)।
জানাযায়, পরিমল সাহার জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার কাবিলা পাড়া গ্রামে। তার বাবা স্বর্গীয় কামিনী সাহা ছিলেন, একজন জোদ্দার। পরিমলের পূর্বপুরুষ ছিলেন আওয়ামী মনা ও মুজিবভক্ত।
৭ মার্চ যখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন তখন পরিমল সাহা মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের একাদ্বশ শ্রেণির প্রথম বর্ষের ছাত্র। তখন থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার মনস্থির করেন। বাবা মার অনুমতি মিলে জুনের দিকে। তখন আর তাক ফেরায় কে। টাঙ্গাইলের বাতেন কমাণ্ডারের অধীনে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ৯ মাসের স্বসশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়। সহযোদ্ধাদের সাথে বীরের বেশে ঘরে ফিরে পরিমল।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করে সুন্দর আগামীর পথে। পথিমধ্যে আসে সেই কাল রাত্রী। যে রাতের অন্ধকারে স্বজাতির বিশ্বাস ঘাতকরা ক্ষমতার লোভে হত্যা করে জাতির জনক ও তাঁর পরিবারকে। পৃথিবী যেন থমকে যায়। বাকরুদ্ধ হয়ে পরে জাতি। ঘাতক খুনিদের ভয়ে দেশরক্ষার কাজে দায়িত্বশীলরা প্রাণ বাঁচাতে কেউ নতিস্বীকার করে, কেউ করে আত্মগোপন। দুই একজন যারা প্রতিবাদ করেন তাদের করতে হয় কারাবরণ।
জাতির এ চরম সঙ্কটময় দুঃসময়ে দেশপ্রেমিক, মুজিবপাগল পরিমলরা ঘরে বসে থাকেনি। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। ঘাতক খুনি মোস্তাক ও জিয়া সরকারের অন্যায়ের সময়োচিত জবাব দিতে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে “জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা ” নামে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিমল সাহা পড়াশোনা ছেড়ে পালিয়ে সে যুদ্ধেও অংশ নেন। যুদ্ধ চলে ৭৫ থেকে ৭৭ পর্যন্ত। সে যুদ্ধে স্বর্বাত্বক সাহায্যকারী বঙ্গবন্ধুর পরম বন্ধু ভারত সরকার প্রধান ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে হেরে যাওয়া পরবর্তী সরকার এসে সাহায্যের হাত বন্ধ করেন দেন। এমন সময় এক সম্মুখ যুদ্ধে ধরা পরেন পরিমল। তারপর তার জীবনে নেমে আসে অমানিশা। শুরু হয় মাসের মাস নির্য়াতন। জিয়া সরকারের সেনাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালায় জুলুম নির্যাতন।
পরিমলের মন থেকে মুজিবের নাম মুছে ফেলতে স্বর্বাত্বক চেষ্টা চালায় তারা । তার মুখের কাঁচা দাঁত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ভাঙে। পায়ের উপর ভর করে যাতে চলতে না পারে সেজন্য হাঁটুর বাটিগুলো পিটিয়ে েেভ্ঙ ফেলে। এভাবে জীবনের তরে পঙ্গু করে দিয়ে তাকে জেলে পুরে দেয়। সেই অবস্থায় ৩ বছর জেল খাটার পর বিশেষ কৌশলে মুক্ত হয়ে পরিমল। কিন্তু, ততক্ষণে তার জীবনের কর্মসারা। মুজিবপাগল পরিমলকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বাপ দাদার সম্পদ শেষ হয়ে যায়। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পরিমল যখন কোনো রকমে উঠে দাঁড়াল তখন আর কোনো কিছু করার সময় সুযোগ ও কোনটাই নাই তার। জীবনের চাওয়া পাওয়া সব অপূর্ণ থেকে যায় । এখন জীবন যেন শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা মাত্র।
দুই সন্তানের জনক এই দম্পতি এখন মারাত্মক অসুস্থ। স্ত্রী ঝুনু রাণীর কিডনি ৬০ভাগ আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন বড় অংকের টাকা। যা যোগার করা তাদের জন্য অসম্ভব। কিন্তু আত্মসম্মান ও আতœমর্যাদার ভয়ে কারও কাছে হাত পাততে পারছেন। কিন্তু, তাকিয়ে আছেন জাতির পানে জাতির বিবেকের পানে।
জাতীয় বীরের এ অব্যক্ত বেদনা ও না বলা কষ্টগুলো কাউকে স্পর্শ করে কি না এটাই দেখার অপেক্ষা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments