Sunday, August 7, 2022
Homeদেশজুড়েজেলার খবরমোটরসাইকেল চালিয়ে ভাগ্য গড়ছেন হাতিয়ার যুবকরা

মোটরসাইকেল চালিয়ে ভাগ্য গড়ছেন হাতিয়ার যুবকরা

ভাগ্য বদলাতে বারবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেও মেলেনি সুযোগ। ঋণগ্রস্থ হতে হয়েছে। এখন এলাকাতেই মোটরসাইকেল চালিয়ে ভাগ্য গড়ছেন মো. শাহাজাহান (৪০)। তিন সন্তানের মধ্যে বড় সন্তানকে পড়াচ্ছেন নোয়াখালী সরকারি কলেজে। বাকি দুজনকে পড়াচ্ছেন এএম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও এএম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

শুধু মো. শাহাজাহান নয়, নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে ভাগ্য গড়ছেন হাজারো যুবক।


শওকত হোসেন ঢাকার চকবাজার থেকে মালামাল ক্রয় করে তা বিক্রি করতেন পুরো হাতিয়ায়। কিন্তু ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক টাকা দেনা হয়ে হয়েছেন। সেই দেনা পরিশোধ করতে বেছে নিয়েছেন এই স্বাধীন পেশা।

শওকত হোসেন  বলেন, আমি চকবাজার থেকে মালামাল এনে ব্যবসা করতাম। কিন্তু একসময়ে আমি অনেক দেনা হয়ে যাই। ফলে আর ব্যবসা করতে পারিনি। তারপর থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। মোটরসাইকেল চালিয়ে দেনা শোধ করেছি। এখন পরিবার নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

জানা যায়, আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে হাতিয়া উপজেলা নোয়াখালীর একটি বৃহত্তম উপজেলা। হাতিয়ার প্রাচীন দ্বীপ ছিল সাগর দ্বীপ। হাতিয়া দ্বীপের বয়স ৩ হাজার বছরের চেয়েও বেশি। দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় সহজ ও দ্রুত চলাচলের যানবাহন মোটরসাইকেল। তাছাড়া সিএনজি অটোরিকশার চেয়ে মোটরসাইকেলের ভাড়াও কম। দ্রুত সময়ের মধ্যে খুব সহজেই স্বল্প ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন যাত্রীরা। সেজন্য যাত্রীদের কাছে মোটরসাইকেলই এখন জনপ্রিয় বাহন। একটি মোটরসাইকেলে দুইজন করে যাত্রী পরিবহন করা হয়। দূরত্ব অনুযায়ী জনপ্রতি ভাড়া সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। একেকজন যুবক সব খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে।


মো. বেলাল উদ্দিনের (৩৫) মুদি দোকান ছিল। অসুখে পড়ে সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভাগ্য গড়ছেন তিনি।

মো. বেলাল উদ্দিন  বলেন, আমার মুদি দোকান ও চায়ের দোকান ছিল। আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করছিলাম। এরপর আমার অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করতে গিয়ে ব্যবসা শেষ হয়ে যায়। গত পাঁচ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালাচ্ছি। এখন আমার পরিবার আগের থেকে ভালো আছে।

মো. নাহিদ (২৫) নামে আরেক মোটরসাইকেল চালক বলেন, আমার পড়াশোনা নেই। তাই কোথাও চাকরি মেলেনি। মোটরসাইকেল চালিয়ে ৮ সদস্যের পরিবারের খরচ চালাচ্ছি। এর জন্য আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া।

হাতিয়ার আল আমিন আইডিয়াল একাডেমির শিক্ষক মো. সাজেদুল আলম ফুয়াদ বলেন, দ্রুত কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমি মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। তবে মোটরসাইকেলের কারণে আমাদের এখানে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। যদি চালকদের কোনো আইনের আওতায় আনা যায় অথবা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে দুর্ঘটনা কমে যাবে।

মো. ইসমাইল হোসেন নামে এক আরোহী  বলেন, মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে ভালো লাগে। আমি যদি সিএনজিতে যাই তাহলে অনেক স্থানে দাঁড়ায় বা যাত্রী তোলে। এক স্থান থেকে দ্রুত অন্য স্থানে যেতে এই দ্বীপে মোটরসাইকেল সব থেকে জনপ্রিয়। কোনো যানজটে পড়তে হয় না বা কারো জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।

হাতিয়া হোন্ডা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক উদ্দিন  বলেন, আমাদের হাতিয়া উপজেলা নদী ভাঙনকবলিত এলাকা। আমাদের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী অনেক মানুষকে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন তারা তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ডিগ্রি বা অনার্সে পড়ে এমন অনেকেই এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। এতে করে তারা তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের খরচ নিজেরা যোগাতে পারছেন।

হাতিয়া হোন্ডা সমিতির সভাপতি মো. বাহার উদ্দিন বলেন, লাখ লাখ টাকা বিদেশে যাওয়ার পেছনে খরচ করে যারা সফল হননি, এমন অসংখ্য যুবক মোটরসাইকেল চালিয়ে ভাগ্য গড়ছেন। কেউ কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে আমরা তাদেরকে চিকিৎসা খরচ দিয়ে থাকি। হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর সহযোগিতায় বেকার যুবকরা যেন অন্যায় কাজে লিপ্ত না হতে পারে সেই জন্য এই মোটরসাইকেলের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সঠিক নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ মিললে এ পেশায় মানুষ সহজে আসতে পারবে।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সেলিম হোসেন বলেন, যেহেতু এটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা, সেজন্য মেইন ল্যান্ডের মতো অনেক সুযোগ-সুবিধা নেই। যাতায়াতের জন্য বাসসহ অন্যান্য যানবাহন অত্যন্ত কম। যার ফলে সব থেকে জনপ্রিয় বাহন হচ্ছে মোটরসাইকেল। সম্প্রতি হাতিয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। যারা মোটরসাইকেল চালায়, তাদের বেশিরভাগের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। গাড়ি চালানোর নিয়মের বিষয়ে তারা সচেতন না। চালক ও আরোহী কেউই হেলমেট ব্যবহার করছেন না। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে থাকি। এ বিষয়ে আরও নজরদারি বাড়ানো হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments