Thursday, April 22, 2021
Home জাতীয় রাজধানীর অধিকাংশ খালেরই উদ্ধার প্রক্রিয়া নানা বাধায় আটকে রয়েছে

রাজধানীর অধিকাংশ খালেরই উদ্ধার প্রক্রিয়া নানা বাধায় আটকে রয়েছে

আ. জা. ডেক্স:

রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ খালই সরকারের উদাসীনতা এবং প্রভাবশালীদের দখলে ভরাট হয়ে গেছে। বর্তমানে যে কটি খাল টিকে রয়েছে সেগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নেই। তাছাড়া অধিকাংশ খালেরই সীমানা নির্ধারণ করা নেই। বরং রাজধানীর অধিকাংশ খালই দখল করে বহুতল ভবন, সড়কসহ নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলোতে পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে। ফলে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনই মূল সীমানা ধরে খালগুলো উদ্ধারে পদে পদে বাধার মুখে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা উচ্ছেদের মাধ্যমে খাল দখলমুক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। অবশ্য ইতিমধ্যে দু-একটি খালের কিছু অংশ পরিষ্কার করে পানির প্রবাহ তৈরি করা হয়েছে। তবে অধিকাংশের উদ্ধার প্রক্রিয়াই নানা বাধার মুখে আটকে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীর খালগুলোতে অব্যাহতভাবে আবর্জনা ফেলায় মাঝপথেই খালের গতি রুদ্ধ হয়ে গেছে। ফলে শহরের চারপাশের নদীর সঙ্গেও অধিকাংশ খালের সংযোগ কাটা পড়েছে। আর তার পরিণতি ভোগ করছে ঢাকা শহরের ২ কোটি বাসিন্দা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী বাসিন্দাদের জলজট ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দুই সিটি কর্পোরেশন দায়িত্ব পাওয়ার পর খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পরিচ্ছন্নতা ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করে। তবে তারা এখনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেনি।

সূত্র জানায়, ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে রাজধানীর খালের সংখ্যা ৫৮টি। আর বেসরকারি গবেষণায় কখনো ৫২টি, কখনো ৪৬টির কথা বলা হয়েছে। তবে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঢাকার দুই সিটির আওতাভুক্ত খালের সংখ্যা ৩৯টি। ইতিমধ্যে ২৬টি খালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিগগিরই বাকি ১৩টি খালের দায়িতও¡ দুই সিটিকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। সিএস রেকর্ড ধরে ওই খালগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা হবে। ওই লক্ষ্যে কাজ করেছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করেই খালের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খালের পারে ওয়ার্কওয়ে, সাইকেল লেন ও সবুজায়ন করা হবে। রাজধানীর পশ্চিমাংশের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁটাসুর, হাজারীবাগ, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, আব্দুল্লাপুর, রামচন্দ্রপুর, বাউনিয়া, দ্বিগুণ, দিয়াবাড়ী, ধোলাইখাল, রায়েরবাজার, বাইশটেকি ও শাহজাহানপুর খাল। আর পূর্বাংশের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মধ্যে রয়েছে জিরানী, মান্ডা, মেরাদিয়া, গজারিয়া, কসাইবাড়ী, শাহজাদপুর, সুতিভোলা, ডুমনি, বোয়ালিয়া, রামপুরা, গোবিন্দপুর, সেগুনবাগিচা ও খিলগাঁও-বাসাবো খাল। বর্তমানে রাজধানীর পুরাতন খালগুলো দখলের পাশাপাশি অনেক খালে নতুন করেও দখলযজ্ঞ চলছে। প্রভাবশালী মহল বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালসংলগ্ন কল্যাণপুর খালের অংশ নতুন করে দখল শুরু করেছে। তারা সেখানে রাতের আঁধারে মাটি ফেলে খাল ভরাট করছে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) দেবধোলাই খাল ভরাট করে পিচ ঢালাই সড়ক নির্মাণ করেছে। ডিএসসিসির নির্মিত সড়কের পাশে বা মাঝখানে দিব্যি খালের সীমানা পিলার রয়েছে। এমন স্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও ডিএসসিসি সেখানে পিচ ঢালাই সড়ক তৈরি করেছে।

মহানগরীর ঢাকা-ডেমরা মহাসড়কের কাজলার পার এলাকা থেকে শুরু হয়ে দেবধোলাই খাল মান্ড খালে মিশেছে। ওই খালের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৯-২৫ মিটার। ওই খালের পাশের বাসিন্দারা কোনো রকম সড়কের জায়গা না রেখেই বহুতল ভবন তৈরি করেছে। তারা সবাই মিলে খালের জায়গা ভরাট করে কাঁচা রাস্তা তৈরি করে। ইউনিয়ন পরিষদ ওই সড়ক ইট বিছিয়ে দেয়। তারপর সিটি করপোরেশনে আওতায় এলে স্থানীয় কাউন্সিলরের অনুরোধে ডিএসসিসি সেটা পাকা করেছে। যদিও ঢাকা ওয়াসা নির্মাণ কাজের সময় বাধা দিয়েছিল। তাছাড়া রামপুরা ব্রিজ থেকে মেরাদিয়া বাজারমুখো প্রবাহিত বেগুনবাড়ী খালের বনশ্রী আবাসিক এলাকাসংলগ্ন অংশবিশেষ দখল করে ফুটপাত তৈরি করা হয়েছে। আর বনশ্রী ‘বি’ বøকসংলগ্ন খালের জায়গা ভরাট করে আবর্জনার কনটেইনার বসিয়েছে ডিএনসিসি। একইভাবে রামচন্দ্রপুর খালের মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের ১ নম্বর ব্রিজের পশ্চিম পাশে খালের অংশবিশেষ ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। মিরপুরের রূপনগর খালের অর্ধেক ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক। ভাসানটেক আবাসন প্রকল্পের আওতায় খালের একটি অংশ দখল করে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। কল্যাণপুর ‘খ’ খাল ভরাট করে সড়ক নির্মিত হয়েছে। কল্যাণপুর ‘চ’ খালের আগারগাঁও এলাকার খালের অংশবিশেষ দখল করে অবৈধভাবে অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাই এসব কাজ করেছে।
সূত্র আরো জানায়, এক সময় ঢাকায় জালের মতো ছড়িয়ে ছিল আঁকাবাঁকা খাল, বিল ও ঝিল।

বৃষ্টি হলে পানি খাল, বিল ও ঝিল হয়ে নদীতে পড়তো। পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার হতো শহর। কিন্তু বিগত তিন দশকের ব্যবধানে রাজধানীর ওসব খাল ও জলাভূমি দখল এবং ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছরই মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিতে রাজধানীর রাস্তাাঘাটে জলজট ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রাজধানীর খালগুলোর প্রবাহ নিশ্চিত করে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সেক্ষেত্রে ঢাকার খালগুলোর বিদ্যমান বেহাল থেকে মুক্ত করতে সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) রেকর্ড ধরে উদ্ধার কাজ শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ নিশ্চিত করে ঢাকার চারপাশের নদীর (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা) সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তবেই খালের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রমের অগ্রগতি হবে। কিন্তু রাজধানীর খাল উদ্ধারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো এ বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারেনি। বর্তমানে শুধুমাত্র রুটিন উচ্ছেদ ও খাল পরিষ্কারের কার্যক্রম পরিচালনা চলছে। কিন্তু কয়েকদিন পর আবারো ওসব খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। খালগুলোর টেকসই উন্নয়ন ও প্রবহমান করতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই দুই সিটিকে সামনে এগোতে হবে। এদিকে রাজধানীর খাল প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার খাল, ড্রেনেজ এবং বক্স কালভার্ট ব্যবস্থার দায়িত্ব ওয়াসার কাছ থেকে ঢাকার দুই সিটির কাছে নিয়ে আসাটা এক ধাপ অগ্রগতি। তবে শহরের টেকসই পানি নিষ্কাশন নকশা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা সিটি করপোরেশনের নেই।

ওই কারণে শহরের ড্রেনেজ, খাল এবং বক্স কালভার্টের দায়িত্ব সিটির হাতে থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় মূল সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কারণ ওসব কাজের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড বেশি কার্যকর সংস্থা। বর্তমানে দুই সিটি কর্পোরেশনই বিদ্যমান খালগুলোর প্রবাহ ঠিক রেখে ধাপে ধাপে খালের দখল ও দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করছে। খালগুলো দখল, দূষণ রোধ করে প্রবাহ ঠিক রাখতে কোথাও কোথাও নতুন নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে হবে। সেক্ষেত্রে সিএস এবং আরএস রেকর্ড ধরে খাল উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। তাহলেই নতুন করে জমি অধিগ্রহণের খুব প্রয়োজন হবে না। ইতিমধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই খালের জমি মহানগর জরিপে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ডও করে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে খাল পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. বদরুল আমিন জানান, খাল উদ্ধার ও প্রবাহ নিশ্চিত করতে পদে পদে বাধা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বেশিরভাগ খালের সীমানা নির্ধারণ করা নেই। সিএস রেকর্ড ধরে ওসব খালের সীমানা নির্ধারণ করা এবং অবৈধ ঘরবাড়ি ও স্থাপনা অপসারণ করতে হবে। তাছাড়া ওসব অবৈধ স্থাপনায় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। ওসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো ওসব সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে বৈধ ও অবৈধ বিবেচনা না করেই সংযোগ দিয়েছে।

একই বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এম সাইদুর রহমান জানান, খাল উদ্ধার ও প্রবহমান করতে নানাবিধ বাধার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নগরবাসী সচেতন নন। সেজন্য তারা গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলে খাল ভরাট করছে। তাছাড়া বিগত ৩০-৪০ বছর ধরে খালগুলোর সঠিক পরিচর্যা না হওয়ায় সংযোগগুলোও কার্যকর নেই। খালের সীমানা চিহ্নিত করা হয়নি। এখন সিএস রেকর্ড ধরে খালের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। তারপর এগুলো দখলমুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন আবর্জনা পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করেছে। এর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) মো. তাজুল ইসলাম জানান, ঢাকার খালগুলো দখলমুক্ত করে মূল আয়তন ফিরিয়ে আনতে দুই সিটি করপোরেশনই কাজ করছে। সেক্ষেত্রে সিএস এবং আরএস রেকর্ড বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ওই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে মন্ত্রণালয়। তবে ইতিমধ্যে যেসব খাল ভরাট করে সরকার সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে সেগুলো এখন ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক। সেসব ক্ষেত্রে হয়তো ছাড় দিতে হবে। ওসব সামগ্রিক বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে। দুই মেয়রও চিন্তা-ভাবনা করছেন। তবে খালগুলোর টেকসই উন্নয়ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ওই লক্ষ্যেই সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

বোরো ধানের ফলনে সন্তুষ্ট চাষি : লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, বলছেন কৃষি অফিস

মোহাম্মদ আলী: বোরো মৌসুমে ধান কাটতে শুরু করেছেন জামালপুরের কৃষকরা। মৌসুম শেষে বিঘা প্রতি তারা যে ফলন পেয়েছেন তাতে...

রৌমারীতে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন

রৌমারী সংবাদদাতা: কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় বালু ব্যবসায়ী চক্র ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে ড্রেজারে বালু উত্তোলনে মরিয়া হয়েছে...

শেরপুরে নারী ইন্টার্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে মারধর করার প্রতিবাদে ১ঘন্টা রাস্তা অবরোধ, আটক-১

নাজমুল হোসাইন: শেরপুরে জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত এক নারী ইন্টার্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় আরেক ইন্টার্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে...

সাড়ে ১০ লাখ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা পাবে বিকাশে

আ.জা. ডেক্স: এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ১০ লাখ দুস্থ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্থিক অনুদান পৌঁছে...

Recent Comments