Thursday, September 29, 2022
Homeজাতীয়রাজস্ব ফাঁকির একটি সাধারণ উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মামলা

রাজস্ব ফাঁকির একটি সাধারণ উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মামলা

আ.জা. ডেক্স:

দেশের বিভিন্ন আদালতে ৩২ হাজারেরও বেশি রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা ঝুলে আছে। তাতে অনাদায়ী রাজস্বের পরিমাণ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। কাস্টমস, এক্সাইজ, ভ্যাট, আয়কর, মূসক ও বন্ড সংক্রান্ত ওসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় অনাদায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তার মধ্যে সুপ্রিমকোর্টে ৮ হাজার ৮২৬টি আপীল ও রিটের বিপরীতে ২৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বার্থানে¦ষী মহল মূলত বিচার বিভাগের চলমান দীর্ঘসূত্রতাকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রেখেছে। তারা মামলাকে রাজস্ব আটকানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ নির্ধারিত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এমন পরিস্থিতিতে বেঞ্চ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুলে থাকা মামলা নিষ্পত্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া জরুরি। এনবিআর ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সারাদেশে বিচারাধীন রয়েছে রাজস্ব সংক্রান্ত ৩২ হাজার ২৫৪টি মামলা। ওসব মামলার বিপরীতে সরকারের রাজস্ব জড়িত ৪৯ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। আপীল বিভাগে ৬৯১ আপীলে রাজস্ব জড়িত রয়েছে ৪ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা; হাইকোর্টে ৫ হাজার ৩৪৭টি রিটের বিপরীতে জড়িত ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং হাইকোর্টে ট্যাক্স ও ভ্যাট আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৭৮৮ আপীলের বিপরীতে জড়িত ৩ হাজার ২৩২ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। আপীল কমিশন ও ট্রাইব্যুনালের ২৩ হাজার ৭২৮ মামলার বিপরীতে আটক ২৫ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা; কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট আপীল কমিশনে ১২ হাজার ৬১৩ মামলার বিপরীতে ১০ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা; কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট আপীল ট্রাইব্যুনাল মামলা ১০ হাজার ৩০৫ মামলায় ৮ হাজার ৬১২ কোটি টাকার রাজস্ব জড়িত রয়েছে। তাছাড়াও আয়কর সংক্রান্ত ৫১০টি মামলায় ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

সূত্র জানায়, রাজস্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে করদাতা কিংবা ব্যবসায়ীরা চাইলে আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। বিভিন্ন সময় এমন বিরোধে করদাতারা আদালতে গেছে। তবে সম্প্রতি এ প্রবণতা বেড়েছে। যে হারে রাজ স্বসংক্রান্ত মামলা হচ্ছে, নিষ্পত্তির হার সে তুলনায় ধীরগতি হওয়ায় দিন দিন মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে যেমন ব্যবসায়ীরা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। একইভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরাও আদালতে মামলা করে আটকে রাখছে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব। এনবিআর কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভ্যাট বা ট্যাক্স দাবি করলে তার বিরোধিতায় আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে আবেদন বা উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা যায়। রিট দায়েরের পর উচ্চ আদালত আবেদন খারিজ করে এনবিআরে পাঠাতে পারে। সেক্ষেত্রে এনবিআরের এ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হয়। সেজন্য দাবিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। এ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজনীয় শুনানি শেষে রায় দেয়। তারপর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই ফের উচ্চ আদালতে আপীল করে। এভাবে গড়িয়ে যায় বছরের পর বছর। উচ্চ আদালতে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য এনবিআরের নিজস্ব কোন আইনজীবী প্যানেল নেই। এ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ই ওসব মামলা পরিচালনা করে। সেক্ষেত্রে এনবিআর ও এ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য একজন সমন্বয়ক কর্মকর্তা পদায়ন করে এনবিআর। তবে ওই পদে এক থেকে দুই মাসের জন্য পদায়ন করা হয়। ফলে ঘন ঘন সমন্বয়ক কর্মকর্তা পরিবর্তনের কারণে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের বেগ পেতে হয়। আর দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে মামলাগুলো। বর্তমানে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টে তিনটি বেঞ্চ রয়েছে। তার মধ্যে দুটি ভার্চুয়াল ও একটি সশরীরে উপস্থিতিতে চলা বেঞ্চ। ওই তিন বেঞ্চে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫টি মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। তবে মামলার সংখ্যা অনুযায়ী এ তিনটি বেঞ্চ পর্যাপ্ত নয়।

সূত্র আরো জানায়, এনবিআরের এ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের আওতায় আয়কর খাতের জন্য ৭টি বেঞ্চ এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও শুল্ক খাতের জন্য ৩টি বেঞ্চ রয়েছে। ওসব বেঞ্চে এ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের দুটি শাখায় মামলা সংক্রান্ত সব কার্যক্রম শুনানি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। এনবিআরের এ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের দুটি আদালতে এক মাসে সর্বোচ্চ ৫টি থেকে ৭টি মামলার শুনানি সম্ভব। তবে কোন কোন মাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সাক্ষীর অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন সমস্যায় তার চেয়ে কমসংখ্যক মামলার শুনানি হয়। অথচ ওসব বিভাগে প্রতি মাসে গড়ে একশ’ থেকে দেড়শ’ নতুন মামলা যুক্ত হয়। ফলে নিষ্পন্ন মামলার তুলনায় অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। তাছাড়া বারবার সময় আবেদনও মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হওয়ার অন্যতম কারণ।

এদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার একটি সাধারণ উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মামলা। বছরের পর বছর ওসব মামলা ঝুললেও তা নিষ্পত্তির আশানুরূপ কোন উদ্যোগ নেই। কিছুদিন আগে এনবিআর অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজুলেশনের (এডিআর) মাধ্যমে রাজস্ব সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এখন ওসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের ওপর সরকারের চাপ প্রয়োগ ছাড়া কোন পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ওসব মামলা নিষ্পত্তিতে এনবিআরের গাফিলতি রয়েছে আর রাজস্ব ফাঁকি দেয়া ব্যবসায়ীরা ওসব মামলা দীর্ঘমেয়াদী করতে নানাভাবে তৎপর।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে উচ্চ আদালতে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা পরিচালনাকারী ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, অনেক সময়ই আবেদনকারী পক্ষ মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় ফেলার চেষ্টা করেন। তবে আইনজীবীরা তৎপর থাকায় এখন সে সুযোগ তারা খুব একটা পায় না।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সদস্য (গ্রেড-১) আলমগীর হোসেন জানান, রাজস্ব ফাঁকির মামলাগুলো দেখার জন্য এনবিআরের লিগ্যাল এ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট নামে একটি বিভাগ রয়েছে। ওই বিভাগ পুরনো মামলাগুলো নিয়মিত নজরদারি করে। রাজস্ব বোর্ডের সদস্যের নেতৃত্বে কর কমিশনারগণ ওই বিভাগে কাজ করেন। আয়কর বিভাগের মতো ভ্যাট এবং শুল্ক খাতেও এমনটি রয়েছে। ঝুলে থাকা মামলা দ্রুত নিস্পত্তির জন্য এনবিআরের একটি এডিআর বিভাগ রয়েছে। তার মাধ্যমে আদালতের বাইরে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তি হয়। তাছাড়া আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও এনবিআরের উইংগুলো এ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments