Friday, April 23, 2021
Home জাতীয় রেলপথে একাধিক সিগন্যাল ব্যবস্থার কারণে দেশে ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ছে

রেলপথে একাধিক সিগন্যাল ব্যবস্থার কারণে দেশে ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ছে

আ.জা. ডেক্স:

রেলপথে একাধিক সিগন্যাল ব্যবস্থার কারণে দেশে ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাতে একদিকে যেমন হতাহতের ঘটনা ঘটছে, তেমনি রেলওয়ের অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রেলওয়ের বিভিন্ন স্টেশনের সিগন্যালে সিবিআই কালার লাইট, নন-ইন্টারলকড কালার লাইট, সিমাফোর আপার কোয়াড্রেন্ট, সিমাফোর লোয়ার কোয়াড্রেন্ট, কেরোসিন বাতি, সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক বাতিসহ নানা ধরনের সিগন্যালিং সিস্টেম ও সিগন্যাল বাতির রাত্রিকালীন উজ্জ্বলতার তারতম্যের কারণে ট্রেনের চালকরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্রু-স্বল্পতার কারণে রানিং স্টাফদের যথাযথ বিশ্রাম না হওয়া, অপারেটিং স্টাফদের ওভার ডিউটির কারণে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা, প্রকৌশল বিভাগের কর্মীদের বিধি অমান্য করে সংশ্লিষ্টদের না জানিয়ে লাইনে কাজ করা, ম্যাটেরিয়াল ট্রলি, পুশ ট্রলি রেললাইনে স্থাপন ও কাজ সম্পন্ন না করে বিপরীতে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা হচ্ছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ রেলওয়েতে সব মিলিয়ে ৪৮৩টি স্টেশন রয়েছে। তার মধ্যে সিগন্যাল ব্যবস্থাসংবলিত স্টেশনের সংখ্যা ৩৫৩টি। ওই ৩৫৩টি স্টেশনে আবার ৫ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মধ্যে সর্বাধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থাটি হচ্ছে রিলে ইন্টারলকিং সিগন্যালিং। ব্যবস্থাটি পুরোপুরি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত। সাধারণত যেসব স্টেশনে ট্রেন চলাচল বেশি, সেসব স্টেশনে এ সিগন্যাল ব্যবস্থা রাখা হয়। রেলওয়েতে এ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থাসম্পন্ন স্টেশনের সংখ্যা মাত্র ২২টি। যার ২০টিই পূর্বাঞ্চলে রয়েছে। আর ১১২টি স্টেশনে কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং সিস্টেম (সিবিআই) ব্যবস্থা রয়েছে। এ দুটি সিগন্যাল ব্যবস্থাকে আধুনিক বলা যায়। বাকি ২১৯টি স্টেশনের সিগন্যাল ব্যবস্থা বেশ পুরনো। ওই পুরনো সিগন্যাল পদ্ধতিগুলোর একটি হলো মেকানিক্যাল ইন্টারলকড সিগন্যাল ব্যবস্থা। ওই ধরনের সিগন্যালের জন্য লাইনের পাশে এক ধরনের তার ব্যবহার করা হয়, যা স্টেশন এলাকায় স্থাপিত লিভারের সঙ্গেসংযুক্ত থাকে। ওই লিভারে টান দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭২টি স্টেশনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দেশের ১২২টি স্টেশনে লাল-সবুজ বাতি ব্যবহার করে ট্রেনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় নন-ইন্টারলকড কালার লাইট সিগন্যালিং। ২৫টি স্টেশনে আবার এ ব্যবস্থাও নেই। ওসব স্টেশনে ট্রেন প্রবেশের আগ মুহূর্তে স্টেশনমাস্টার ঠিক করে কোন লাইন দিয়ে ট্রেনটি যাবে। সে অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ট্রেন যাওয়ার লাইনটি ঠিক করে দেয়। এ পদ্ধতিকে বলা হয় নন-ইন্টারলকড মেকানিক্যাল সিগন্যালিং সিস্টেম। বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০১৯ সালের ইনফরমেশন বুকের তথ্যানুযায়ী এখনো দেশের ১৩০টি স্টেশন সিগন্যালিং সুবিধার বাইরে রয়েছে। রেলওয়ের হিসাবে ৪৮৩টি স্টেশনের মধ্যে মাত্র ১৩৪টিতে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আছে। বাকিগুলোয় ভিন্ন ভিন্ন পুরনো ব্যবস্থায় ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, গত বছরের ২৭ অক্টোবর ঝিনাইদহের সাফদারপুরে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ট্রেন দুটির একটি ছিল মালবাহী, অন্যটি জ¦ালানি তেলবাহী। ওই ঘটনায় ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার জ¦ালানি তেল নষ্ট হয়। আর দুটি ট্রেনই বাতিল হয়ে যায়। তাছাড়া ট্রেন দুটির ইঞ্জিন ও দুর্ঘটনাস্থলের রেললাইনও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে সিগন্যাল অমান্য করায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। যার দায় রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগকে দেয়া হয়। তার আগে ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তাতে ১৭ যাত্রীর মৃত্যু হয়। সেখানেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকের সিগন্যাল অমান্য করার বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে।

এদিকে রেলওয়ের সিগন্যালিং ব্যবস্থা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরদের মতে, উন্নত বিশ্বে ট্রেনের সিগন্যাল ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তি এসে জটিল ওই কাজটি সহজ করে দিয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা সেসব দেশে ট্রেন পরিচালনাকেও সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। এখানে কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই নামানো হয় একের পর এক ট্রেন। কিন্তু ওই ট্রেনগুলো সুশৃঙ্খল ও ঝুঁকিমুক্তভাবে চলাচলের জন্য যে সিগন্যাল ব্যবস্থা দরকার সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। এখানে বড় বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক উন্নয়ন হচ্ছে। যেসব উন্নয়নে ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে সেসব উন্নয়নকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করে একের পর এক ট্রেন নামানো হচ্ছে। যার খেসারত একের পর এক দুর্ঘটনার মাধ্যমে দিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী বেনু রঞ্জন সরকার জানান, রেলওয়ের আইন অনুযায়ী ‘ডি’ ক্যাটাগরির স্টেশনে সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। সিগন্যাল সিস্টেম না থাকা স্টেশনগুলো ওই ক্যাটাগরিতেই পড়েছে।

এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানান, ইতোমধ্যে রেলওয়ের ১৩৪টি স্টেশনকে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব স্টেশনেই আধুনিক ও অভিন্ন সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোকে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে। তবে কাজটির পরিধি হওয়ায় দেশের সব স্টেশন আধুনিক ও অভিন্ন সিগন্যাল ব্যবস্থায় আনতে কিছুদিন সময় লাগবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

বোরো ধানের ফলনে সন্তুষ্ট চাষি : লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, বলছেন কৃষি অফিস

মোহাম্মদ আলী: বোরো মৌসুমে ধান কাটতে শুরু করেছেন জামালপুরের কৃষকরা। মৌসুম শেষে বিঘা প্রতি তারা যে ফলন পেয়েছেন তাতে...

রৌমারীতে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন

রৌমারী সংবাদদাতা: কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় বালু ব্যবসায়ী চক্র ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে ড্রেজারে বালু উত্তোলনে মরিয়া হয়েছে...

শেরপুরে নারী ইন্টার্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে মারধর করার প্রতিবাদে ১ঘন্টা রাস্তা অবরোধ, আটক-১

নাজমুল হোসাইন: শেরপুরে জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত এক নারী ইন্টার্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় আরেক ইন্টার্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে...

সাড়ে ১০ লাখ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা পাবে বিকাশে

আ.জা. ডেক্স: এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ১০ লাখ দুস্থ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্থিক অনুদান পৌঁছে...

Recent Comments