Tuesday, November 30, 2021
Home জাতীয় সরকারের কঠোর অবস্থানে স্বাস্থ্য খাতের রাঘববোয়াল প্রতারকরা আতঙ্কিত

সরকারের কঠোর অবস্থানে স্বাস্থ্য খাতের রাঘববোয়াল প্রতারকরা আতঙ্কিত

আ.জা. ডেক্স:

মহামারী করোনা প্রাদুর্ভাবে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি উলঙ্গ হয়ে পড়েছে। অর্থের লোভে করোনার নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে প্রতারণায় জড়িয়েছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক। মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনার নমুনা সংগ্রহ ও চিকিৎসার অনুমোদন দিয়েছে। সে সুবাদে নমুনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট প্রদান থেকে শুরু করে চিকিৎসায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় সবকিছুই করা হয়েছে। এমন অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাচ্ছে, সেখান থেকেই বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়মের প্রমাণ। প্রতারণার সাথে জড়িত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের তালিকা ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী হাতে রয়েছে। ওই তালিকায় অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানেরও নাম রয়েছে। ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাতেই চিকিৎসার নামে বছরের পর বছর ধরে প্রতারণা করে আসা স্বাস্থ্য খাতের রাঘববোয়ালরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তারা র‌্যাবের অভিযান থামাতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পাশাপাশি ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭ হাজার ২৪৪টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মেরও অভিযোগ রয়েছে। মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেটের সহায়তায় ওসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বছরের পর বছর ধরে অনৈতিক কাজ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই চক্রটি আরো সক্রিয় হয়ে উঠে। এমন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র‌্যাবের অভিযানে স্বাস্থ্য খাতে নানামুখী প্রতারণার নাটকীয় সব ঘটনা সামনে আসছে। দেশে করোনা সংক্রমণের পর নমুনা পরীক্ষা নিয়ে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ভর করেছিল। একইভাবে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও একের পর এক বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটে। দুর্যোগময় ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে মনোবল ফেরান। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার চিকিৎসা দূরের কথা, অন্যান্য রোগে আক্রান্তদেরও চিকিৎসা সেবা দেয়নি। করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে পথেই অনেকের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালত থেকেও রোগী ভর্তির আদেশ দেয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। আর জনবল সংকটের কারণে নমুনা পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান করোনা নমুনা সংগ্রহের কাজে সহায়তা নামে এগিয়ে আসে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সুবাদে শেষ পর্যন্ত তাদের ভয়ংকর প্রতারণার কথা প্রকাশ পায়। নমুনা সংগ্রহের নামে ভুয়া সনদ প্রদান ও চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে তারা শুধু মানুষের জীবনকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে। এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় অনিয়মে জড়িত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। এ অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে ব্যাপক জনমতও তৈরি হয়েছে। সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও চলমান অভিযান আরো জোরালো করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নামে একটি চক্র সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। করোনা পরিস্থিতি না এলে হয়তো এদের মুখোশ উন্মোচন হতো না। জেকেজি-রিজেন্ট হাসপাতালের মতো ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকা অন্য প্রতারকদেরও বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। কিন্তু এরই মধ্যে প্রভাবশালী একটি চক্র চলমান অভিযান থামানোর মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে। তারা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে লবিং চালাচ্ছে। সম্প্রতি তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পরিবর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সূত্র আরো জানায়, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকরা চলমান অভিযানের মুখে তটস্থ। তারা অনুকম্পা চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহায়তা চান। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহবান জানান। তাদের মতে, যদি কেউ অন্যায় করে তাকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্তের মধ্য দিয়ে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। র‌্যাবের অভিযানের পর অনেক চিকিৎসক চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছে। তারা কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সবকিছু যাতে নিয়মমাফিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা হলে ভালো হয়। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না। কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এতে কেউ ছাড় পাবেন না।

এদিকে অভিযান প্রসঙ্গে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। যখনই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাবে সঙ্গে সঙ্গে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এটিই সরকারের নির্দেশনা। সুতরাং যত বড় বা শক্তিশালী ব্যক্তিই হোক না কেন অন্যায় করে কেউ রেহাই পাবে না। এ অবস্থায় সবার প্রতি আহবান থাকবে, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করুন।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বেসরকারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মবিন খান জানান, যেভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে তাতে রোগী এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভীতি ছড়াচ্ছে। অনেক বড় বড় হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন নেই। কিন্তু লাইসেন্স নবায়নের জন্য অনেকে টাকা জমা দিয়েছে। আবার অনেকে প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। করোনা মহামারির এই সময়ে এসব বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

আর চলমান অভিযান অব্যাহত থাকার কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, যারা বা যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে, তারা কেউ ছাড় পাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেই এই অভিযান চলছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কেউ প্রতারণা করবে- সরকার তা হতে দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে যত ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক, কেউই কোনো ছাড় পাবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

অ্যান্টার্কটিকায় প্রথমবারের মতো এয়ারবাসের অবতরণ

আ.জা. আন্তর্জাতিক: প্রথমবারের মতো অ্যান্টার্কটিকায় অবতরণ করেছে একটি এয়ারবাস। অ-৩৪০ মডেলের এই বিশালাকার উড়োজাহাজটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে...

ইরানের পরমাণু সমঝোতা পুনরুজ্জীবনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু

আ.জা. আন্তর্জাতিক: ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে নিযুক্ত রুশ প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানভ বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতা পুনরুজ্জীবনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার...

মন্ত্রী নাকি রকস্টার?

আ.জা. বিনোদন: সাজু খাদেম মঞ্চে ডা. মুরাদ হাসানকে নিয়ে বিশেষণ ব্যবহার করলেন খানিকক্ষণ, কেননা এখন প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন...

সেন্সরে জমা পড়ল ‘যুদ্ধজয়ের কিশোর নায়ক’

আ.জা. বিনোদন: ক্যারিয়ারের প্রথম দুটি চলচিত্রই মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে। শায়লা রহমান তিথির প্রযোজনা ও পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের গল্পভিত্তিক চলচিত্র...

Recent Comments