Tuesday, April 20, 2021
Home জাতীয় সহজে ও স্বল্প খরচে আমদানির সুযোগেও ব্যাগেজ রুলসে দেশে বিপুল স্বর্ণ ঢুকছে

সহজে ও স্বল্প খরচে আমদানির সুযোগেও ব্যাগেজ রুলসে দেশে বিপুল স্বর্ণ ঢুকছে

আ. জা. ডেক্স:

সরকার সহজে ও স্বল্প খরচে আমদানির সুযোগ দেয়া সত্তে¡ও বৈধ পথে দেশে খুব বেশি স্বর্ণ আমদানি হচ্ছে না। বরং ব্যাগেজ রুলসের সুবিধা নিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দেশে ঢুকছে। হঠাৎ করেই এতো বেশি পরিমাণে স্বর্ণ প্রবেশ নিয়ে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারাও বিস্মিত। তাদের ধারণা, সরকারকে শুল্ককর দিলেও দেশে ঢোকা স্বর্ণের একটি বড় অংশ চোরাচালানকারীদের হাতেই যাচ্ছে। তাছাড়া বাণিজ্যিক আমদানির চাইতে ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে স্বর্ণ আনায় খরচ সাশ্রয় ও হয়রানিমুক্ত হওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায়ীদেরও অনেকে ওই কৌশলে স্বর্ণ আনছে। আইনগতভাবে এ ব্যবস্থা অবৈধ না হওয়ায় ওসব স্বর্ণ আটকানো যাচ্ছে না। কিন্তু বিমানবন্দরের বাইরে এসেই স্বর্ণের বাহক বদলে যাচ্ছে। ঢাকা কাস্টম হাউজ ইস্যুটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অবহিত করেছে। ওসব কারণে বহুল আলোচিত স্বর্ণ নীতিমালার আওতায় বাজারে শৃঙ্খলা আনার সরকারি উদ্যোগও ভেস্তে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা ব্যাগেজ রুলসে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছে। এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার অবৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি ঠেকানোসহ ওই খাতে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে নীতিমালা তৈরি করে। যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে আমদানির সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি ব্যাগেজ রুলসেও কর পরিশোধ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ আনার সুযোগ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ১ হাজার ৩৫৮ কেজি স্বর্ণ প্রবেশ করেছে। যার দাম প্রায় ৮১৫ কোটি টাকা। আর কেবল ডিসেম্বরেই ওই বিমানবন্দর দিয়ে এসেছে আগের ৩ মাসের প্রায় সমান (১ হাজার ৩১৩ কেজি) স্বর্ণ। অথচ তার আগের বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী ৩ মাসে ব্যাগেজ রুলসের সুবিধায় আনা স্বর্ণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ কেজি। আর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমেও গত নভেম্বর থেকে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যাগেজ রুলসের আওতায় দেশে ১ হাজার ৮৫০ কেজি স্বর্ণ প্রবেশ করেছে। ওসব স্বর্ণের মধ্যে তেমন স্বর্ণালংকার ছিল না। প্রায় সবই ছিল স্বর্ণের বার। ইস্যুটি নিয়ে এনবিআরের শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগ ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা চলছে।

সূত্র জানায়, ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী বর্তমানে যাত্রীরা বৈধ পথে ২৩৪ গ্রাম স্বর্ণ বা দুটি বার (প্রায় ২০ ভরি) সঙ্গে আনতে পারে। এর শুল্ককর ৪০ হাজার টাকা। আর নারী যাত্রীরা ১০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার করমুক্ত উপায়ে আনতে পারে। একজন যাত্রী কতবার ওই সুযোগ নিতে পারবে আইনে সে বিষয়ে কিছু বলা নেই। তবে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী শুল্ক বিভাগ সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যাগেজ রুলে আসা স্বর্ণ সংশ্লিষ্ট যাত্রী কিংবা বৈধ ব্যবহারকারীদের জন্য আসছে না। শুল্ক পরিশোধ করা যাত্রীরা কেবল বাহক হিসেবে কাজ করছে। প্রত্যেক যাত্রী দুটি স্বর্ণের বার এনে ঘোষণা দিয়ে সরকারকে ৪০ হাজার টাকা ট্যাক্স দিচ্ছে। তার বাইরে হয়তো বহন করার জন্য বাহক কিছুটা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। মূলত অবৈধ উপায়ে স্বর্ণ ধরার ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ির কারণে চোরাচালানকারীরা এ পথটি বেছে নিচ্ছে। কেউ হয়তো ৬০টি স্বর্ণের বার বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে চাইছে, সেজন্য ৩০ জন যাত্রীকে দুটি করে বার দিয়ে দেবে। ওসব কাজে বিশ্বস্ত যাত্রীদের ব্যবহার করা হয়। এমনকি পুরো কার্যক্রমে প্রযুক্তিরও সহায়তা নেয়া হয়। বাহকরা বিমানবন্দরে এসে ঘোষণা দিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় কর পরিশোধ করছে। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসার পর নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় ওসব স্বর্ণ হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। ওই সময় যে স্বর্ণ বহন করে এনেছে, তাকে চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক পুরস্কার দিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেখা গেছে অনেক যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে, যারা ঘন ঘন বিদেশে যাওয়া-আসা করছে। আসার সময় দুটি করে বার নিয়ে এসে ঘোষণা দিয়ে সরকারকে কর পরিশোধ করছে, যা অস্বাভাবিক। শুরুতে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই ওসব স্বর্ণ হাতবদল হতো। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ধরার পর চোরাকারবারীরা সতর্ক হয়ে যায়।

সূত্র আরো জানায়, দেশের স্বর্ণ খাতে আইনি কাঠামো কিংবা নজরদারির মধ্যে না থাকায় ওই খাতে এখনো শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সরকার স্বর্ণ নীতিমালা পাশ করে। ওই নীতিমালার আওতায় বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। ১৯ জন ডিলার স্বর্ণ আমদানির অনুমোদন নিয়েছে। তারাও প্রতি ভরিতে ২ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করে স্বর্ণ আমদানি করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) তথ্যমতে, গত প্রায় ২ বছরে বাণিজ্যিকভাবে দুই চালানে মাত্র ১৮ কেজি স্বর্ণ এসেছে। বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানিতে ভরি প্রতি ২ হাজার টাকা শুল্ককর ছাড়াও ব্যাংক চার্জ, বিমা খরচ, বিএসটিআই কর্তৃক মান পরীক্ষার চার্জসহ সব মিলিয়ে আরো দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ ব্যাগেজ রুলসের সুবিধা নিয়ে আনা স্বর্ণে ভরি প্রতি ২ হাজার টাকার বাইরে আর কোনো খরচ হচ্ছে না। আর আমদানির ক্ষেত্রে ভরি প্রতি খরচ পড়ছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

এদিকে সরকার সর্বশেষ ২০১৯ সালে সরকারের ব্যাগেজ রুলসের সংশোধন হয়েছে। ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে আনা স্বর্ণের বিষয়ে ‘নট ফর সেল অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন’ কথাটি লেখা থাকে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তদারকির শক্ত কোনো আইনি কাঠামো নেই। ফলে শুল্ককর পরিশোধের কাগজপত্র কিংবা যাত্রীর পাসপোর্টের কপি রেখে একটি ভালো অংশই জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের হাতে যাচ্ছে। বাজুসের জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাও ওসব স্বর্ণ কিনছে বলে জানা যায়। অবশ্য বাজুসের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা ব্যাগেজ রুলসের আওতায় আনা স্বর্ণ জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা কিনছে না বলে দাবি করেছে। তার মতে, স্বর্ণ আমদানি নীতিমালার কিছু দুর্বলতার কারণে আমদানিকারকেরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। আমদানি করলে সব মিলিয়ে খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা আর ব্যাগেজ রুলসের আওতায় এলে মাত্র ২ হাজার টাকা। আবার আমদানির ক্ষেত্রে স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য বিএসটিআর রিপোর্ট পাওয়ার আগে স্বর্ণ পাওয়া যায় না। ওসব কারণে বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি হচ্ছে না বললেই চলে। কিন্তু হঠাৎ করে ব্যাগেজ রুলসের আওতায় এতো বেশি পরিমাণ স্বর্ণ দেশে আসার কারণ হিসেসে শুল্ক কর্মকর্তাদের ধারণা, স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতে বিভিন্ন পক্ষের ব্যাপক তৎপরতার কারণে চোরাকারবারিরা ওই পথকে এখন ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। কারণ ধরা খেলে সব স্বর্ণই চলে যাচ্ছে। আবার নিজেরাও ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ওই কারণে ভরিপ্রতি ২ হাজার টাকা আর যাত্রীর খরচসহ কিছু বাড়তি টাকা গেলেও ব্যাগেজ রুলসের পথ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।

এ প্রসঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাকি বিমানবন্দরে এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন্স) মো. আলমগীর হোসেন জানান, গত কয়েক মাসে বিমানবন্দরে এমন ধরনের প্রায় ১৫টি আটকের ঘটনা ঘটেছে। দেখা গেছে, যার কাছে স্বর্ণ পাওয়া যাচ্ছে, তিনি বিদেশ থেকে আসা যাত্রী নন কিংবা ওই স্বর্ণ কর দিয়ে বৈধ করার রিসিটও তার নামে নয়। আবার এক ব্যক্তির হাতে অনেকগুলো স্বর্ণের বার। ওসব ঘটনায় আটক করে মামলা করার পর চোরাচালানিরা এখন আর বিমানবন্দরে তেমন ধরা পড়ছে না। বরং ব্যাগেজ রুলসে আসা ওসব স্বর্ণই চোরাকারবারীদের হাতে চলে যাচ্ছে।

একই প্রসঙ্গে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে আমদানি হওয়া পণ্যের শুল্ককর আদায়ে দায়িত্ব পালনকারী ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, আইনের বিধানের কারণে ব্যাগেজ রুলসে আসা ওসব স্বর্ণ আটকানো যাচ্ছে না। কারণ তা বৈধ। তবে বিষয়টি এনবিআরকে অবহিত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

লকডাউন চলবে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত

রমজানের শুরু থেকে বাস্তবায়ন হওয়া লকডাউন আরেক দফা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লকডাউন চলবে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত। আগের যে ১৩ দফা শর্ত...

২৪ বছরেও বাড়ি ফিরতে পারেনি গাদুর পরিবার

মোহাম্মদ আলী: জামালপুর শহরের ফৌজদারী মোড়ের শহর রক্ষা বাঁধ। বাঁধের ঠিক নিচেই ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের ঢালে ছোট্ট ছাপড়া করে...

লকডাউন: জামালপুরে মোবাইল কোর্টে ১০৫ জনকে ৭৬ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সর্বাত্মক লকডাউনের পঞ্চম দিন ১৮ এপ্রিল সরকারি নির্দেশনা অমান্য করায় জামালপুরে ১০৫ জনের বিরুদ্ধে মামলায় মোট ৭৬...

সাত দিনের রিমান্ডে মামুনুল

আ.জা. ডেক্স: হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ এপ্রিল) বেলা সাড়ে...

Recent Comments