সিমেন্ট ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স অলিম্পিক ফাইবার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি তিন বছরে প্রায় কোটি টাকার ওপরে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। গত পাঁচ বছর আগে থেকে রাজস্ব সংক্রান্ত প্রতারণা শুরু করে বরিশালের রূপাতলিতে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের বিপরীতে রেয়াত ও ভ্যাটফাঁকি দিয়েছে এক কোটি তিন লাখ টাকা।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের গোয়েন্দা অডিটে এমন তেলেসমাতি ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পরিশোধে ইতোমধ্যে মেসার্স অলিম্পিক ফাইবার লিমিটেডকে নোটিশও দিয়েছে এনবিআর।
অলিম্পিক ফাইবার লিমিটেডকে দেওয়া চিঠি ও এনবিআর সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি সিমেন্ট ব্যাগ ও সুইং ব্যাগসহ সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন করে থাকে। যার মূল উপকরণ পি পি ইয়ান গ্রেড, পি পি কো-পলিমার, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, ক্র্যাফট লাইনার পেপার, মাস্টার ব্যাচ, প্রিন্টিং কালি, থিনার, সুতা, গ্লু এবং প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল আমদানি করা হয়ে থাকে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির রেয়াত ও উৎসে মূসক বা ভ্যাট সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হয়। ওই সময়ে অপরিশোধিত রাজস্বের বিষয়টি নিশ্চিত হয় এনবিআর।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল ক্রয়বাবদ এক লাখ ৩৮ হাজার ৯২৩ টাকা, নিরীক্ষাধীন সময়ে মূল্য ঘোষণায় প্রতি একক উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ এবং বিক্রয় রেজিস্ট্রারে প্রদর্শিত মোট উৎপাদনের বিপরীতে ক্রয় রেজিস্ট্রারে ব্যবহৃত উপকরণে ১৪ লাখ ৫৪ হাজার ৮১২ টাকা এবং ওই একই সময়ে সরবরাহ মূল্যের বিপরীতে অপরিশোধিত ৬৮ লাখ ১৩ হাজার ২৭৫ টাকার সম্পূরক শুল্ক ও মূসক বা ভাট বাবদ ১০ লাখ ২১ হাজার ৯৯১ টাকাসহ ফাঁকিকৃত শুল্ক ও ভ্যাটের পরিমাণ মোট ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৬ টাকা।
এ ছাড়া, স্থানীয় উপকরণ ও সেবা ক্রয়ের বিপরীতে গৃহীত রেয়াত বাবদ ১০ হাজার ৬৯১ টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় যথাসময়ে মূল্য ঘোষণা প্রদান না করায় ৭.৫ শতাংশের অতিরিক্ত মূল্যের বিপরীতে অতিরিক্ত গৃহীত রেয়াত হিসাবে তিন লাখ ৮০ হাজার ৯৯৮ টাকার ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে আসে তদন্তে। সি.এ ফার্মের অডিট রিপোর্ট মোতাবেক বিভিন্ন খরচের বিপরীতে উৎসে মূসক বাবদ ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৫ টাকার ঘাপলা পাওয়া গেছে।
সবমিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি রেয়াত ও উৎসে মূসক বা ভ্যাটবাবদ মোট এক কোটি ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৫৪ টাকা শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।
ভ্যাট অফিস জানিয়েছে, নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী মেসার্স অলিম্পিক ফাইবার লিমিটেডের কর ফাঁকির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২- এর ধারা ১২৭ অনুযায়ী ভ্যাট প্রদেয় হওয়ার নির্ধারিত তারিখের পরবর্তী দিন থেকে প্রকৃত পরিশোধের দিন পর্যন্ত বকেয়ার ওপর মাসিক সুদ প্রযোজ্য হবে। যা আদায়যোগ্য।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল খুলনা ভ্যাট অফিসের ডেপুটি কমিশনার বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি অডিট টিম প্রতিষ্ঠানটিতে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। পরেই এসব ভ্যাট ফাঁকির তথ্যগুলো বেরিয়ে আসে।
ইতোমধ্যে খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের অফিস থেকে দেওয়া এক চিঠিতে মেসার্স অলিম্পিক ফাইবারকে ফাঁকিকৃত ভ্যাটের টাকা পরিশোধে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিহারকৃত মূসক ও উৎসে মূসকবাবদ ওই টাকা জরিমানাসহ কেন আদায় করা হবে না, সে বিষয়ে বক্তব্য থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে দাখিলের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
গত ২১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে এ চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। শুনানিতে প্রতিষ্ঠানটির এমডি বা তাদের মনোনিত প্রতিনিধিকে লিখিত জবাব ও প্রয়োজনীয় দলিলাদিসহ (পাঠযোগ্য) উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য বলা হয়েছে।
শুনানি প্রদানে ব্যর্থ হলে বক্তব্য নেই বলে ধরে নেওয়া হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার সৈয়দ আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে অডিট করে ওই টাকার ফাঁকি পাওয়া গেছে। তাদেরকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের দেওয়া নথিপত্রের ওপর ভ্যাট দাবি করা হয়েছে। মেনে নিলে নিষ্পত্তি হবে, না হলে আইনগত প্রক্রিয়া মেনে আদায় করা হবে।’
জানতে চাইলে মেসার্স অলিম্পিক ফাইবার লিমিটেডের ভ্যাট ম্যানেজার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘চিঠি পেয়েছি। আমাদের যা বক্তব্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে দেব, আপনাকে কেন দেব? তাদের দাবির বিষয়টি পর্যালোচনা করে জবাব দেওয়া হবে।’