ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুরের পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৪ প্রার্থী। দেশ স্বাধীনের পর যতবার সংসদ নির্বাচন হয়েছে, বেশির ভাগ সময় জেলার প্রতিটি আসনে ভোটযুদ্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় প্রথমবারের মতো ভোটের মাঠে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। ভোটে জিততে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের দিকে তাকিয়ে বিএনপি-জামায়াত উভয় দলের প্রার্থীরা।
জামালপুর-১ ও ২ আসনে সাবেক এমপি এবং অন্য তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির পরিচিত মুখ বা হেভিওয়েট প্রার্থী। ফলে মাঠ পর্যায়ে দলীয় সাংগঠনিক অবস্থান ও ভোটের সমীকরণে বিএনপির প্রার্থীরা রয়েছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। জনসমর্থন পেতে ভোটের মাঠে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও।
জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি সাবেক এমপি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মিল্লাত এমপি থাকার সময় সীমান্তবর্তী উপজেলায় উন্নয়নমূলক কাজ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন– জামায়াতে ইসলামীর নাজমুল হক সাঈদী, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় পার্টির এ কে এম ফজলুল হক ও গণঅধিকার পরিষদের রফিকুল ইসলাম।
এই আসনে ভোটার চার লাখ ৩১ হাজার ৭০৭ জন। স্থানীয়দের মতে, এখানে ভোটযুদ্ধ হবে বিএনপি-জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর মধ্যে। তবে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিএনপি প্রার্থী মিল্লাতের অবস্থান অনেকটাই সুসংহত।
জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনে মূলত ভোটযুদ্ধ হবে বিএনপির সাবেক এমপি সুলতান মাহমুদ বাবু এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক ড. অধ্যক্ষ ছামিউল হক ফারুকীর মধ্যে। এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন– ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সুলতান মাহমুদ ও স্বতন্ত্র অর্ণব ওয়ারেস খান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত রাশেদ মোশারফকে হারিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির সুলতান মাহমুদ বাবু। পাঁচ বছরের ব্যবধানে নদ-নদী ভাঙনকবলিত ইসলামপুরের ব্যাপক উন্নয়ন করেন। নদীভাঙন রোধসহ উপজেলা সদরের সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। এবারও ভোটারের মুখে তাঁর উন্নয়নকর্মের কথা উঠে আসছে। অপরদিকে, জামায়াতের প্রার্থী ড. অধ্যক্ষ ছামিউল হক ফারুকীর সৎ ও জনবান্ধব নেতা হিসেবে খ্যাতি রয়েছে। তিনি ১৯৯১ ও ৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হেরে যান। এবার পশ্চিম ইসলামপুরের ছয়টি ইউনিয়নের মানুষ অনেকটাই একাট্টা হওয়ায় ভোটের মাঠে তাঁর অবস্থান সুদৃঢ় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে এই আসনে এবার বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই হতে পারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এ আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৮২ হাজার ৮৮ জন।
জামালপুর-৩ (মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯ প্রার্থী। তারা হলেন– মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক মোস্তাফিজর রহমান বাবুল, জামায়াতের মজিবুর রহমান আজাদী, জাতীয় পার্টির মীর শামসুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের দৌলতুজ্জামান আনছারী, গণসংহতি আন্দোলনের ফিদেল নঈম, গণঅধিকার পরিষদের লিটন মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুর রহমান, শিবলুল বারী রাজু ও ফারজানা ফরিদ। এই আসনটি মূলত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা মির্জা আজম টানা সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এই আসনে একাধিকবার নির্বাচন করে মির্জা আজমের কাছে হেরে যান। কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচনী মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। ফলে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভোটাররা এখানে বড় ফ্যাক্টর। এলাকার মানুষের কাছে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবার এখানে ভোটযুদ্ধ হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে। আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন যিনি পাবেন, তাঁর জয়ের পাল্লাই ভারী হবে। এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৩ জন।
জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত আব্দুস সালাম তালুকদারের ভাতিজা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। এই আসনে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল।
এই আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন– গণঅধিকার পরিষদের ইকবাল হোসেন, নাগরিক ঐক্যের কবির হাসান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলী আকবর, কমিউনিস্ট পার্টির মাহবুব জামান জুয়েল। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী অনেকটা নির্ভার বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ চার হাজার ৯৯২ জন।
জামালপুর-৫ (সদর) আসনে প্রার্থী ১০ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী ময়মনসিংহ বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও জামালপুর জেলা বিএনপির একাধিকবারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামালপুর পৌরসভার দুইবারের মেয়র। একজন বিনয়ী মানুষ হিসেবে জেলা সদরের ভোটারদের কাছে তাঁর সুনাম রয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি যেমন কর্মীবান্ধব, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছে জনবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত। এই আসনটি আওয়ামী লীগের পুরোনো ঘাঁটি। এবার মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় নির্বাচনে ভোটের লড়াই হবে বিএনপির অ্যাডভোটে শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন ও জামায়াতের মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তারের মধ্যে।
এই আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন– ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ ইউনুছ আহাম্মদ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের আবু সায়েম মোহাম্মদ সা-আদাত-উল-করীম, গণঅধিকার পরিষদের জাকির হোসেন, জেএসডির আমির উদ্দিন, জাতীয় পার্টির বাবর আলী খান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির শেখ আক্কাছ আলী, স্বতন্ত্র মাসুদ ইব্রাহিম ও হোছনেয়ারা বেগম।
জামালপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল জানান, ভোটকেন্দ্রে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে কিনা– তা জনগণ এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। সুষ্ঠু ভোট হলে সাধারণ মানুষ এবার জামায়াতকে ভোট দেবে এবং তাদের দলের প্রার্থীরা পাঁচটি আসনেই জয়ী হবেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, গত ১৭ বছর জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছেন তারা। তাই জনগণ এবার বিএনপিকেই সমর্থন দেবে। তাঁর ভাষ্য, জেলার সাতটি উপজেলার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে
দল ও অঙ্গ সংগঠনের সক্রিয় নেতাকর্মীরা
নির্বাচনী মাঠে নিরলস কাজ করছেন। ফলে নির্বাচনে পাঁচটি আসনেই বিএনপি বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবে।
