ঋতুর সাথে পেশা বদল ও বঞ্চনার শিকার তবুও দুর্গম যমুনার চর ছাড়তে নারাজ স্থানীয়রা

লিয়াকত হোসাইন লায়ন : ঋতু পরিবর্তনের সাথে নদ নদীরও গতিপথ বদলে যায়। ঠিক তেমনি ঋতুর সাথে দূর্গম যমুনা চরের মানুষের পেশাও বদলায়। জামালপুরের ইসলামপুর দূর্গম যমুনা চরের বসবাসকারী মানুষের জীবন যেন রাষ্ট্রের চোখের আড়ালে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস। নদীভাঙন, দারিদ্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেও তাদের দূর্দশা নিরসনে নেই কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ।
যমুনা নদীর চরগুলোতে চারটি ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক বেশি মানুষ। প্রতি নিয়তই প্রকৃতির সাথে লড়াই করছে। লড়াই করছেন নদীর নিষ্ঠুর ভাঙনের সাথে। যমুনা চরসহ নদী পাড়ে বসত করা এসব মানুষ নদীর গতি প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। অভাব অনটন, ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকলেও চরের মানুষ চর ছাড়তে নারাজ। নদীর টানেই চরের মানুষ আশায় বুক বেঁধে পড়ে থাকে ভাঙা ও জীর্ণশীর্ণ ঘরে। বুক ভরা আশা, যে নদী দিনের পর দিন তাদের সর্বস্ব গ্রাস করেছে। তবুও বুক ভরা আশা হারিয়ে যাওয়া জমি আবার জেগে ওঠা। শত দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে অভাব-অনটন নিয়ে চরের মাটিকেই আঁকড়ে ধরে আছেন। তাদের ধারণা, ভাঙা গড়াই নদীর খেলা। বছরের পর বছর নদী ভাঙ্গনে বারবার বসত বাড়ী স্থানান্তর তাদের নিত্যদিনের ঘটনা হলেও নদীভাঙন প্রতিরোধে টেকসই বাঁধ বা অবকাঠামো নির্মাণে তেমন অগ্রগতি নেই।
তাদের মতে বর্ষাকালে উত্তাল নদীর ¯্রােতধারার সাথে নদীবক্ষে বয়ে আনবে উর্বর পলি। শুস্ক মৌসুমে জেগে ওঠা সেই নরম পলিতে ফসল ফলাবে। নদী যেমন দুঃখ দেয়, কেড়ে নেয় বসত বাড়ি আবাদি জমি। তেমনি নদীই তাদের সৌভাগ্য বয়ে আনে। জমি হারানোর ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পরিবারগুলো চরম দারিদ্রের মুখে পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা নদীর বালির চরে মরিচ, ধান, পাট, চিনা, কাউন, বাদাম, তিল, তিশি চাষ করে আবার স্বাবলম্বিও হচ্ছে। এছাড়াও ঋতু পরিবর্তনের সাথে তারা পেশা বদল করে। এক সময় জেলে। কোন সময় নৌকার মাঝি। আবার এক সময় কৃষক। সময়ে ঘাটের ঘাটে কুলি-মজুরের কাজ করে।
চরবাসী রিপন মন্ডল বলেন, এই জীবনে শান্তি নাই। কখন নদী ঘর নিয়ে যাবে বলা যায় না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারি না, অসুস্থ হলে নৌকায় করে শহরে নিতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অথচ এসব এলাকায় নেই স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগকালে ত্রাণ এলেও তা অপ্রতুল। সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন নারীরা। নিরাপদ প্রসব ও চিকিৎসাসেবার অভাবে মাতৃত্ব হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদ্যালয় সংকট ও যোগাযোগ সমস্যায় শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্বকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চরবাসীর দাবি, শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেই এ অঞ্চলটি উপযুক্ত বাসযোগ্য হবে।