দেওয়ানগঞ্জে ১৫% পিসি দিলেই সব প্রকল্প হালাল

মোহাম্মদ আলী : প্রকল্পের কাজ হোক বা না হোক, ভালো হোক বা মন্দ, অচল হোক বা সচল ১৫% পিসি দিলেই টিআর কাবিখা কাবিটার সব প্রকল্প হালাল হয়ে যায়। বেশকয়েক বছর যাবত লোভনীয় এই সুযোগটি লুফে নিচ্ছেন কতিপয় ইউনিয়নের দুর্নীতি পরায়ণ চেয়ারম্যান মেম্বাররা।
এমন সুযোগ মিলছে জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন শাখায়।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের সরেজমিন তথ্যমতে ও বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মেম্বারদের সাথে কথা বলে উপরের তথ্য সমূহ উঠে এসেছে ।
গত ২৫ অগাস্ট থেকে ২৭ অগাস্ট পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাংধরা, চর আমখাওয়া, পাররামরামপুর, হাতিভাঙ্গা, বাহাদুরাবাদ, চিকাজানি, চুকাইবাড়ি ও সদর ইউনিয়নের সদ্য সমাপ্ত কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, ৩য় পর্যায়ের প্রকল্পের সময় শেষ হয়ে গেলেও এখনো এসব ইউনিয়নের বেশকিছু প্রকল্প শেষ হয়নি। কোনোটা শুরুতেই, কোনোটা মাঝপথে এসে বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কোনোটা শুরুই হয়নি। আছে কিছু ভূয়া প্রকল্পও। তথাপি এসব প্রকল্পের সভাপতিরা বরাদ্দ উত্তোলনের পায়তারায় লিপ্ত।
সরেজমিন গিয়ে ডাংধরা ইউনিয়নের কাবিখা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত পাথরেরচর পাকা রাস্তা থেকে বদিয়ার বাড়ির দক্ষিণে পাকা রাস্তা পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ও মাখনের চর অহিজ আমজাদের বাড়ি হতে মিয়া চাঁনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে কাজে হাত দেয়নি প্রকল্পের সভাপতিরা। এব্যাপারে ডাংধরা ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল আজিজ বলেন, আমি জেলখানায় ছিলাম। কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা বলতে পারব না। ওই ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান, ফরিদ উদ্দিন বলেন, আমাদের ইউনিয়নে ১২টির মতো প্রকল্প চলছে। তাদের মধ্যে ৪টির কাজ শেষ, ৪টির কাজ চলমান আর ৪টি প্রকল্পের কাজ এখনো ধরা হয়নি।
চর আমখাওয়া দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার আরেকটি ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নেও হচ্ছে ১২ এবং ১৫ লাখ টাকার মতো কাবিখা কাবিটার বড়ো বড়ো প্রকল্প। যার সিংহভাগের কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে প্রকল্প এলাকার মানুষের মধ্যে। এ ইউনিয়নে তিতুর দোকান থেকে সামিউলের দোকান পর্যন্ত সিসি করণ নামে ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি কাবিটার প্রকল্প তালিকায় থাকলেও কার্যতঃ বাজার উন্নয়ন তহবিল থেকে কাজটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, বাজারের কিছু ব্যবসায়ী। তালিকা অনুযায়ী সিলেট পাড়া কোরবান আলীর বাড়ি থেকে উত্তর দিকে হামিদের বাড়ি পর্যন্ত ১২ লাখ টাকার একটি কাবিটা প্রকল্পের কাজের সম্পর্কে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান, জিয়াউল হক বলেন, আমার জানা মতে, আমার ইউনিয়নে ১২ লাখ টাকার কোনো কাজ নেই!
এর চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পাররামরামপুর ইউনিয়নের। এই ইউনিয়নের কাবিখা প্রকল্পের অধীনে ১নং ওয়ার্ড পাথরেরচর মেইন রোড হতে মানিজলের বাড়ি ও কাবিটা প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ রহিমপুর ব্রিজের দক্ষিণ দিকে আজাদ মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্প দুটিতে হাত লাগায়নি প্রকল্প সভাপতিরা। এছাড়া শুরুতেই বন্ধ হয়ে গেছে ভিটাকান্দি লাল মিয়া দফাদারের বাড়ি হতে পশ্চিমে সাঁকোয়া পর্যন্ত নামের প্রকল্পটি। বাকি প্রকল্পগুলোতে কাজের নামে লুটপাট হয়েছে বলে দাবি ইউনিয়নবাসীর। এ ব্যাপারে পাররামরামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জেকে সেলিম বলেন, আমি নানা জটিলতার কারণে কয়েক মাস পরিষদের বাইরে থাকায় আমার ইউনিয়নের প্রকল্পগুলোর কাজের ব্যাপারে খোঁজ নিতে পারিনি । তবে, আমি সব প্রকল্প সভাপতিদের সঠিক ভাবে কাজ করতে বলে দিয়েছি। তারা যদি তা না করে থাকেন তাহলে তারা তার দায় ভার নিবেন।

হাতিভাঙ্গা ইউনিয়নের বেশকয়েকটি কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পে নয়ছয়ের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ইউনিয়নের একজন ইউপি সদস্য বলেন, ১৫% পিসি দিলেই যারা কাজ করে তারাও বিল পায়, যারা করে না তারাও পায়। তাহলে আর কাজ করে লাভ কি? পিসি দিলেই বিল মিলে। তিনি আরও বলেন, পিসি ছাড়াও পিপি জমা দেওয়ার সময় প্রকল্প সভাপতিদের ৫ হাজার করে টাকা দিতে হয় পিআইও অফিসে। এটা এখন সিস্টেম হয়েগেছে। একারণেই প্রকল্পগুলোতে কাজ করতে চায় না সভাপতিরা।
বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের কলাকান্দা গ্রামের প্রকল্প এলাকার বাসীন্দা মোঃ ইউনুছ জানান, চরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে যে সরকারি বরাদ্দ আসে তা সংশ্লিষ্ট অফিস, চেয়ারম্যান ও মেম্বার হয়ে এলাকা পর্যন্ত পৌঁছায় না। কাগজে কলমেই থেকে যায়। ছিটাফোঁটা কিছু পৌঁছলে তার অস্তিত্ব থাকে না। ধুলা বালিতে হারিয়ে যায়। এমন অভিযোগের সাথে তাল মিলিয়ে বাহাদুরাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান, শাহজাহান মিয়া বলেন, আমার দায়িত্ব কালিন সময়ে এই ইউনিয়নের রাস্তা ঘাটের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা বিগত ১৫ বছরে হয়নি।
চিকাজানি ইউনিয়নের কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পেও দুর্নীতি অনিয়মের আলামত মিলেছে। খোলাবাড়ি বাজার থেকে এরেন্ডাবাড়ি সীমানা পর্যন্ত রাস্তা মেরামত এই ইউনিয়নের কাবিটা প্রকল্পের একটি বড়ো কাজ। একাজেও রয়েছে নানা অভিযোগ। এলাকাবাসী জানান, খোলাবাড়ি বাজার থেকে নদীর পাড় দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁচা রাস্তাটি গত বছর ইসলামি রিলিফ বাংলাদেশ নামে একটি এনজিও তৈরি করে দিয়েছিল। এবার রাস্তাটি মেরামতের নামে ১৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, চেয়ারম্যান রাস্তাটির কিছু গর্ত ভরাট করে এবং তার উপর মাটির প্রলেপ দিয়ে কাজ শেষ করে দিয়েছেন। প্রকল্পটির প্রায় ১ কিলোমিটার রাস্তায় হাত লাগানো হয়নি। এ প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ অপব্যবহার হয়েছে বলে বিশ্বাস এলাকাবাসীর। এব্যাপারে চিকাজানি ইউপি চেয়ারম্যান, আক্কাস আলী বলেন, আপনারা দেখলে দোষ ত্রুটি খোঁজে পাবেন। অস্বীকার করি না। তবে, আমরা বরাবর যেভাবে করি এবারও সেভাবেই করেছি।
চুকাইবাড়ি হলকার চর দক্ষিণ পাড়া সেলিম ডাক্তারের বাড়ি থেকে দক্ষিণে ইসলামপুরের সীমানা পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পটি দৃশ্যমান হলেও কাজের মান ও সমাপ্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে খুদ জনপ্রতিনিধির মধ্যে। কত টাকার কাজ? কে করেছে? জানেন না ওই ওয়ার্ডের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। অপর একজন জনপ্রতিনিধি জানান, কাজটি স্থানীয় একজন প্রভাবশালী নেতাকে দিয়ে অফিস নিজেই করেছে। একাজেও অর্থের সদ ব্যবহার হয়নি বলে বিশ্বাস এলাকাবাসীর। কাজটি সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা। তবে, এব্যাপারে বার বার চেষ্টা করেও চুকাইবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অসুস্থ থাকায় প্যানেল চেয়ারম্যান, এনামুল হক বলেন, আমাদের ইউনিয়ন উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত । সবার নজর এখানে। এছাড়া জেলা থেকে ডিসি এডিসি যারাই আসেন সবাই আমাদের ইউনিয়ন পরিদর্শন করেন। এখানে দুর্নীতি করা যায় না। তারপরও এই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ আমাদের ব্যাপারে অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু, তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ মিলেনি।
৮টি ইউনিয়নের প্রাপ্ত তথ্যমতে এবারের কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের ২০% এর কাজে বেশি দুর্নীতি হয়েছে।
সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ব্যবস্থা না থাকায় ২০% এর কাজগুলো স্থানীয় প্রশাসন করছে বলে জানা গেছে। আর প্রশাসনের হয়ে এই ২০% কাজের কর্তৃত্ব করেন গ্রামীণ রাস্তা ও সেতু/কালভার্ট প্রকল্পে নিয়োগ প্রাপ্ত, পিআইও অফিসের কার্য-সহকারী মোঃ সোহেল মিয়া। শুধু তা-ই নয়, ১৫% পিসি সংগ্রহ ও বন্টনের কাজটিও তিনি করেন। দীর্ঘদিন ( ২০১৭ সাল) একই উপজেলায় কর্মরত থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাঝে সোহেলের আধিপত্য গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমেই তিনি হাতিয়ে নিচ্ছেন কাঁচা পয়সা। যা দিয়ে তিনি বিলাসী জীবন যাপন করেন। মাসে দুই একবার বাংলাদেশ এয়ারলাইনসএ চড়ে কক্সবাজার ট্যুরে যান। সাথে থাকে প্রিয়জনরা।
অথচ সম্প্রতি, পিআইওদের প্রতি, সোহেলের প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক আবু নাছের মোহাম্মদ বাবর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ব্রিজ কালভার্ট ব্যতিত উন্নয়নমূলক কাজে কার্য-সহকারীদের নিয়োজিত না করার জন্য অনুরোধমূলক আদেশ করা হয়েছে।
এব্যাপারে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন শাখার কার্য-সহকারী, সোহেল মিয়া, কোনো রকম দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও প্রকল্প তদারকি ও ১৫% পিসি সংগ্রহ করার কথা স্বীকার করে বলেন, কাবিটা কাবিখার ৩য় পর্যায়ের কাজগুলো আমি এখনো দেখিনি। তাই বিলও দিইনি। প্রকল্পের অর্থ পিআইওর একাউন্টে জমা আছে। আমরা কাজ না দেখে বিল কাউকে দিব না। আপনাকে তো প্রকল্প তদারকির কাজে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে কিভাবে যান? উত্তরে তিনি বলেন, আমি না গেলে কে যাবে বলেন? পিআইও’র একার পক্ষে কি এতো কাজ করা সম্ভব?
এব্যাপারে কয়েক মাস আগে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, মোঃ খবিরুজ্জামান খান এর বক্তব্য সংগ্রহ করতে গেলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য যে, পিআইও খবিরুজ্জামান খান ইসলামপুরে উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন কালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে সে উপজেলা থেকে স্ট্যাণ্ড রিলিজ করা হয়েছে।