দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে এবং এই আন্দোলনকে তিলে তিলে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট (আইইডিবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য। শফিকুর রহমান বলেন, একসময় গণভোট হারাম, আরেক সময়- না, এটা অর্ধেক হালাল। একসময় একই অর্ডারের গোস্ত হালাল, কিন্তু শুধু ঝোলটা তার হারাম। আমরা এটা পার্লামেন্টে বলেছি, আপনারা দেখেছেন আমাদের কণ্ঠ দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, আমরাও সমানতালে চালিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ সুযোগ পাই না পাই, আমরা কণ্ঠ বন্ধ করিনি। কারণ জনগণ আমাদের তো তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে সেখানে পাঠিয়েছে। জনগণ মুখ বন্ধ করে বসে থাকার জন্য পাঠায়নি, বরং তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলার জন্য পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সংসদে যাওয়ার আগেই বলেছি, এই সংসদের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেওয়ার জন্য আমরা এখানে যাচ্ছি না। অনেক সুবিধা আছে, স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেব, নেবই না। যেটা না নিয়ে পারবো না সেইটা নেব, বাধ্য হবো যেটাতে। অবৈধ কোনো দিকে আমাদের চোখ এবং হাত যাবে না। জামায়াতের আমির বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান কেবল শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনীতিবিদদের আন্দোলন নয়। প্রায় ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ শহীদের বাড়িতে আমার ব্যক্তিগতভাবে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এই শহীদদের ৬২ শতাংশই শ্রমিক। তারা কি কৌটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল? কৌটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল আমাদের যুবসমাজ, ছাত্র সমাজ। তারা নেমেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। তারা নেমেছিল একটা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তিনি সংসদের বর্তমান অবস্থাকে জুলাই প্রোডাক্ট হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জুলাই নাই আমরাও নাই। জুলাই আছে আমরা আছি, জুলাই আছে সরকার আছে, জুলাই আছে বিরোধী দল আছে, জুলাই নাই, কিছুই নাই। এই জুলাইয়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকার পার পাবে না ইনশাআল্লাহ। গণভোটের গণরায়ের মাধ্যমে এই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়ন হবে। এর জন্য আবার জীবন দিতে হলে দেব, ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, কালকে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে জুলাই শহীদ পরিবার এবং যোদ্ধাদের সঙ্গে আমাদের একটা বৈঠক ছিল। সেখানে আমার প্রিয় সহকর্মী, সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেছেন- আগামীর আন্দোলনে সঙ্গে নয়, সামনে থাকবো আমরা ইনশাআল্লাহ। আমাদের সামনে পাবেন, আমিও কথা দিচ্ছি সামনে পাবেন ইনশাআল্লাহ। যতদিন জাতির অধিকারের পক্ষে লড়াই করা প্রয়োজন, ততদিন সংসদে থাকবো, তার বাইরে এক সেকেন্ডও নয়। এই আন্দোলন কোনো সুবিধাবাদী আন্দোলন নয়, ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ-বাটোয়ারার নয় মন্তব্য করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই আন্দোলন ৭০ ভাগ মানুষের রায়ের প্রতি সম্মান দেখে, শহীদদের রক্তের সঙ্গে তাদের ওয়াদা বাস্তবায়ন করার জন্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশবাসী আপনারা শুধু পাশে থাকবেন। এই আন্দোলন আমার জন্য, আপনাদের জন্য, সবার জন্য। আমরা আমাদের সন্তানদের কারও গোলাম বানাতে চাই না। কারও পারিবারিক রাজতন্ত্র বাংলাদেশে চলবে জাতির ওপর ফ্যাসিজম হিসেবে, তাও আমরা বরদাশত করব না। রাজনীতির এই দুষ্টচক্র ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের এক-তৃতীয়াংশ সময় একজনের বদলে আরেকজনের প্রশংসায় ব্যয় হোক, এটা আর দেখতে বা শুনতে চাই না। প্রশংসা হবে জনগণের, সংসদের ভেতরে কথা হবে জনগণের সমস্যা নিয়ে, সেখানে বসে খোলামেলা সমাধান বের করে আনতে হবে। এটাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো কিছুর চর্চা হোক সংসদের ভেতরে, আমরা এটা চাই না। তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আমরা ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া এখন সংসদে দেখতে পাচ্ছি। ওই সংসদে দাঁড়িয়ে আজকে যারা সরকারি দলের গ্যালারিতে বসেছেন, তাদের একসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যেভাবে কথা বলা হতো, আজকে দুই-একজন আমাদের লক্ষ্য করে সেরকম কথা বলা শুরু করেছেন। আমরা তাদের বলি, জিহ্বা সংযত করুন। এই মনোভাব এবং আচরণ দেখাবেন না। জুলাইযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেই প্রজন্ম, যেই দেশ গড়ে উঠেছে, এই দেশ কারও চোখ রাঙানির পরোয়া করে না। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বছেন, জনগণের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন। পাঁচ কোটি মানুষের গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে দেশে নতুন সংকট তৈরি করবেন না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন, তা না হলে যারা অতীতে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বেছে নিয়েছিল, তাদের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা ও চিফ হুইপসহ সব সংসদ সদস্যের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি অনেকটা বাকশালি কায়দায় দমনের প্রচেষ্টা। আপনারা সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন, কিন্তু মনে রাখবেন, সংবিধান শুধু আপনারা একাই পড়েন না, আমরাও বুঝি। আইনমন্ত্রী ও চিফ হুইপকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা যদি গণভোটের পক্ষে ভোট দিয়ে থাকেন, তবে এখন কেন তাকে অবৈধ বলছেন? নিজের দেওয়া ভোট অস্বীকার করা মানে নিজের আত্মপরিচয় অস্বীকার করা। সত্য স্বীকার করুন এবং সংস্কার পরিষদের বৈধতাকে মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করুন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসেই আপনারা ব্যাংক থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। রেমিট্যান্স কমছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে এবং দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট হচ্ছে। এই সংকট সমাধানের পরিবর্তে আপনারা ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বর্তমান সরকারকে শেখ হাসিনার ‘ভূতে’ ধরেছে। শেখ হাসিনাকে যে ভূত ধরেছিল, তিনি বিতাড়িত হওয়ার পর সেই ভূত এখন বর্তমান সরকারের ওপর সওয়ার হয়েছে। আর সেই ভূত হলো জনগণকে অপমান করার। মামুনুল হক বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকাল ছিল এদেশের জনগণকে নিয়ে উপহাস করা। তিনি জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে উন্নয়নকে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। সবশেষে চার কোটি ছাত্র-জনতাকে ‘রাজাকার’ বলে গালি দিয়ে নিজের পতনের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরেছেন। তিনি জনগণকে অপমান করার পরিণতি ভোগ করছেন। বিএনপির ভূমিকার সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে তারাও জনগণকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণকে মূর্খ সাব্যস্ত করা হচ্ছে এবং সংবিধান পড়ার ছলে ৩০০ সদস্যের জনপ্রতিনিধিদের মাস্টার সাজানোর চেষ্টা চলছে। দাম্ভিকতার একটা সীমা থাকা উচিত। তিনি সাঈদী এর একটি গল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সিংহ, গাধা ও শিয়ালের শিকার বণ্টনের মতো পরিণতি যেন কারো না হয়। শেখ হাসিনা গাধার মতো বোকামি করে আজ সীমান্তের ওপারে গিয়ে পড়েছেন। ৭০ বছরের পুরোনো দল আওয়ামী লীগকে তিনি ধ্বংস করে দিয়েছেন। বিএনপিকেও সেই পথ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। ক্ষমতার দাপটে জনগণকে ক্ষুদ্র না ভাবার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতার মসনদে বসলে ইঁদুরও নাকি নিজেকে সিংহ ভাবে। বিএনপিও এখন নিজেদের সিংহ ভাবছে। কিন্তু মনে রাখবেন, গণভোটের রায়কে এভাবে উপেক্ষা করার নজির বিশ্ব ইতিহাসে নেই। নিজেদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবেন না। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিএনপির প্রতি আমাদের এটা সর্বশেষ শুভকামনা। এরপরও যদি আমাদের কিছু বলতে হয়, তবে আন্দোলনের মাঠে কথা হবে। রাজপথে আপনাদের মোকাবিলা করা হবে।