নিজস্ব সংবাদদাতা : এক সময় যাদের ছিল আবাদি জমি ও বসতভিটা, আজ তারা নিঃস্ব। অভাব-অনটন আর দুঃখ-কষ্টে মানবেতর জীবনযাপন এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। শিক্ষার আলো জ্বলে না সংসারে, জোটে না দুবেলা দুমুঠো অন্ন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে কেউ পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানী ঢাকায়, কেউবা দেশের অন্য অঞ্চলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে দিশেহারা এসব মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সুদিন। এমনই করুণ চিত্র জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার নদীভাঙন কবলিত এলাকার মানুষের।
একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম নদী-বিধৌত অঞ্চল। উপজেলায় মোট জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৬১৮ হেক্টর, যার মধ্যে কৃষিজমি ১৮ হাজার ৭৪৪ হেক্টর। উত্তরে ডাংধরা ও দক্ষিণে দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়ন। উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত এই উপজেলার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, জিঞ্জিরাম ও দশানী নদী উপজেলার বিভিন্ন অংশ দিয়ে প্রবাহিত।
এক সময় দো-আঁশ মাটির সমতল ভূমির এই জনপদ ছিল কৃষিতে সমৃদ্ধ। গোলাভরা ধান, গোহালভরা গরু আর আত্মকর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগে স্বচ্ছল জীবন কাটাত এখানকার মানুষ। কিন্তু সত্তর দশকের পর নদীগুলোর উৎপত্তি ও গতিপথ পরিবর্তনের ফলে শুরু হয় ব্যাপক নদীভাঙন। ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায় মানুষের সুখ-স্বচ্ছলতার দিন। নদীপাড়ের মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ।
যমুনা নদীর ভাঙনে ডাংধরা ইউনিয়নের পশ্চিমাংশ এবং চরআমখাওয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। খোলাবাড়ি, চিথুলিয়া, মোল্লারচর, এরান্ডাবাড়ি, জিগাবাড়ি, মৌলভীরচর, চুনালীপাড়া, মুন্সিপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সানন্দবাড়ী পশ্চিমপাড়া ও পাটাধোয়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
চরআমখাওয়া ইউনিয়নের সানন্দবাড়ী লম্বাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন হলেও কোনো স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এক সময় আমাদের সুখের সংসার ছিল, আজ সব হারিয়ে নিঃস্ব।”
চুনালীপাড়া গ্রামের দিলবর হোসেন জানান, চারবার নদীভাঙনে তার বসতভিটা ধ্বংস হয়েছে। পাঁচ বিঘা আবাদি জমিও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তার মতো কয়েকশ পরিবারের একই অবস্থা। চুনালীপাড়া গ্রামটি এখন শুধুই স্মৃতি।
হাতিভাঙ্গা ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র ও জিঞ্জিরাম নদী ভেঙে দিয়েছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। চরহাতিভাঙ্গা, পোল্যাকান্দি, ফারাজীপাড়া, গুমেরচর, নয়াগ্রাম, মদনেরচর ও মাদারের চর এলাকার শতশত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। চর জেগে উঠলেও ভাঙনের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেনি অধিকাংশ মানুষ।
চরপোল্যাকান্দি গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, “তিনবার নদীভাঙনে আমার ঘর ভেঙেছে। জেগে ওঠা চরে বসতি স্থাপন করলেও সেখানে নেই রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা নিরাপদ ভবিষ্যৎ। সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়া করানো সম্ভব হচ্ছে না।”
উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের চিকাজানী ও চুকাইবাড়ী ইউনিয়ন যমুনা নদীর ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। চরহলকা হাবরাবাড়ি, টিনেরচর ও বরুলেরচরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যমুনা নদী পাড়ি দিয়েই এসব গ্রামে যেতে হয়। নেই হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা যোগাযোগ ব্যবস্থা। দিনমজুরি আর চরের জমিতে ফসল ফলিয়েই চলে মানুষের জীবন।
চুকাইবাড়ী ইউনিয়নের বীরহলকা গ্রামের মানিক মিয়া বলেন, “আমাদের গ্রাম বহু আগেই নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন রেললাইনের পাশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। অর্থাভাবে সন্তানদের ভালো শিক্ষা দিতে পারছি না।”
একই ইউনিয়নের টিনেরচরের ভিক্কু মিয়া জানান, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৯ বিঘা জমি ও বসতভিটা যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় দিনমজুরি করে পরিবার চালাচ্ছেন তিনি।
দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মাইছানিরচর, তিলকপুর ও কাউনেরচর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে প্রতিবছর বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাচ্ছে শত শত পরিবার। যাদের এক সময় সব ছিল, আজ তাদের দাঁড়াতে হচ্ছে পথে।
তিলকপুর গ্রামের ফজলু মিয়া বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মপুত্র নদ ভাঙলেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভাঙনের কারণে মানুষের জীবনমান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, “আমি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। দেওয়ানগঞ্জ যে নদীভাঙন কবলিত এলাকা, তা জানা আছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে যমুনার নদীপাড়ের মানুষের জীবন
