ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে নতুন করে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তার মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে দৈনিক আরো ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৯২০ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রায় এক দশক আগে যদিও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ঢাকা ওয়াসা ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে দুটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কিন্তু এখনো বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পথেই হাঁটছে। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে ঢাকার প্রায় ৬৫ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ওই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরো বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমলেও নগরীতে বেড়েই চলছে মানুষ। সেজন্য চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন উৎস খুঁজতে হচ্ছে। যদিও মেঘনা নদী থেকে ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। কিন্তু সেগুলো শেষ হতে আরো কয়েক বছর লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যমান পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করতে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। তাতে ভূগর্ভস্থ স্তরে আরো চাপ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিই শুকিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা এলাকার। ঢাকার মাটিরও প্রায় একই অবস্থা।
সূত্র জানায়, রাজধানীতে পানির চাহিদা মেটাতে ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ’ শীর্ষক প্রকল্প নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা । তার মধ্যে ৫৫৩ কোটি টাকা ঋণ এবং বাকি ৩৬৮ কোটি টাকা অনুদান থেকে আসবে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে চলতি বছরের থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৮৮টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপন, ৪৫০ সেট পাম্প মোটর সেট সরবরাহ ও স্থাপন, নতুন করে ৬২টি গভীর নলকূপ, ৪৫০টি ভ্যারিয়েবল ফ্রিকোয়েন্স সরবরাহ ও স্থাপন, ৪৮০ সেট পাম্প ডেলিভারি লাইন স্থাপন, ২৫০টি পাম্প ঘর, ২৮০ গভীর নলকূপ রি-জেনারেশন, ১২৪টি স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপন ও ৬০টি গভীর নলকূপ রি-হ্যাবিলিটেশন নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া প্রকল্প কার্যক্রমে থাকছে বৈদ্যুতিক কেবল সরবরাহ, কলাম পাইপ সরবরাহ, বাউন্ডারি ওয়ালসহ অন্যান্য নির্মাণ কার্যক্রম।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী ঢাকার পানির স্তর প্রায় সাত ফুট নিচে নেমে গেছে। মূলত একদিকে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, অন্যদিকে ঢাকাকে ইট-পাথর দিয়ে ঢেকে দেয়ার ফলে ঢাকার বাসিন্দারা দীর্ঘমেয়াদি পানির সংকটে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে। ঢাকায় সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে ভূ-উপরিস্থ থেকে পানি সরবরাহ করতে ২০১৩ সালে মেঘনা নদীর পানি শোধনাগার প্রকল্প অনুমোদন পায়। ‘ঢাকা ওয়াসার ঢাকা এনভারনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই (ডিইএসডব্লিউএস)’ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি পরিশোধন। তৃতীয়বার সংশোধিত ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। জমি অধিগ্রহণ, ঠিকাদার চূড়ান্ত করা, বিলম্বিত দরপত্র ও অনুদান সংস্থার অর্থছাড়ের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা প্রকল্পটি এক যুগ পার হলেও এখনো আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার আরেক প্রকল্প সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেজ-৩) (সং-২)-এর অবস্থাও আরো নাজুক। ২০১৫ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশের মতো। সেই সঙ্গে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকায়। ২০২০ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফায় মেয়াদ বেড়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।
এদিকে পানি বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি রাজধানীর পানি ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করছে। ঢাকার মতো বড় শহরের জন্য পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা জরুরি। বড় প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ না হলে বিকল্প উদ্যোগ নিতে হয়, যা সাধারণত ব্যয়বহুল এবং টেকসই সমাধান নয়। ইতিমধ্যে ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহ করতে নিয়ে বড় বড় পাইপলাইন করা হয়েছে। কিন্তু এখন ভূগর্ভস্থ থেকে পানি তোলার জন্য প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। যা বুমেরাং পরিকল্পনা এবং ক্ষতিকর।
অন্যদিকে পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টদের মতে, ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায়ই ধীরগতির হয়। বিশেষ কারণ হচ্ছে ঋণ ও অনুদানে ওসব প্রকল্প নেয়া হয়। যখন বিদেশী ঋণে বা কোনো সংস্থার অনুদানে প্রকল্প নেয়া হয় সেখানে প্রধান চ্যালেঞ্জ থাকে সংশ্লিষ্ট দেশ বা সংস্থার অর্থছাড়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখে বিদেশী সংস্থা অর্থছাড় করে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর প্রভাব পড়ে। তবে জরুরি পানি সরবরাহ নামের প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা দেখে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এরই মধ্যে প্রকল্পটির অনুমদন দেয়া হয়েছে এবং একনেকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সুপারিশে বলরা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা মহানগরীর ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগারগুলোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে তা চালু হওয়া পর্যন্ত পানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী শওকত মাহমুদ জানান, পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পগুলো শেষ না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সময়ে পানি সরবরাহ স্মুথ রাখতে প্রকল্পটি নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দৈনিক ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা ঢাকার দুটি সিটির আওতাধীন বাসিন্দাদের জন্য সরবরাহ করা হবে।
রাজধানীর সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে ঢাকা ওয়াসার বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিকল্পনা
