ব্যাংকিং খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: অর্থমন্ত্রী

আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী এ সব কথা জানান। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিচ্ছে, ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প ও সহজ শর্তের বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত থেকে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা হ্রাস করা এবং জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা এবং ফিসক্যাল স্পেস তৈরির মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) এবং মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিএমএফ) প্রণয়নে একটি ডায়নামিক ম্যাক্রো-ফিসকাল মডেল উন্নয়ন করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবায়ন উপযোগী প্রক্ষেপণ করে সে অনুযায়ী সেক্টরাল বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই লক্ষ্য করেছি, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি পূরণে শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর; যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যমান ছিল। অর্থমন্ত্রী জানান, ১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজতর হয়। ২. রাজস্ব সংস্কার: আমরা করজাল বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন ও অটোমেশন করছি যাতে ঋণের নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ অর্জিত হয়। ৩. পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা: আমরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। ৪. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: আমরা এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছি; যা প্রকৃত জিডিপি বাড়াবে এবং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এটি করা হবে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ঋণপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং সহনীয় হারে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে। ৫. সামাজিক সুরক্ষা: শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার দক্ষ সম্প্রসারণ। অর্থমন্ত্রী বলেন, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; যা বাস্তবায়নে উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া হবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালু করে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজম্বের স্বাভাবিক চক্রকে সচল করার মাধ্যমে আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে। এদিকে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিতে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভুর্তকি দিতে হবে। এ জন্য বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়েছে; যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চিয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এর প্রভাবে সরকারকে চলতি অর্থবছরের মার্চে বিদ্যুৎ জ্বালানি এলএনজিতে নির্ধারিত ভর্তুকির চেয়ে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। এটি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর সম্ভাবনার দিকে যাবে। অন্যদিকে সমপরিমাণ প্রায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলবে। সরকার এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সরকারের অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হলেও জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখে সরকার এখন পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করে পূর্বের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মুক্তি আমাদের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে এবং আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন, নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছর বাজেট প্রণয়ের কাজ হাতে নিয়েছি। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের কাছে জনগণের যে প্রত্যাশা, সে সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন। অন্যদিকে জনগণ উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমাদের সীমা আমাদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখবেন এটাও আমরা আশা করি। তিনি বলেন, আমাদের এবারের লক্ষ্য কেবল প্রবৃদ্ধি নয় বরং একটি টেকসই স্বচ্ছ অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিএনপি এ দেশে বহদলীয় গণতন্ত্রে প্রবর্তন করে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যাত্রা শুরু করে। পরে বেগম খালেদা জিয়া এক ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করেন। কারণ শিল্পের বিকাশ বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রস্তুতি মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটিয়ে দীর্ঘদিন প্রবৃদ্ধির পথ পরিক্রমার সূচনা করেছিলেন। ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন শুল্ক আমদানি কাঠামো আধুনিক বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে তিনি অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার ধারণ করে আমরা আজ আবার বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি প্রোগ্রেসিভ অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্ত টেকশই পথে পরিচালিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমরা এটা করতে চাই স্বচ্ছতা সত্যতা ও জবাবদিহির ওপর নির্ভর করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মিশনারি চিন্তার মাধ্যমে এটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারবো ইনশল্লাহ।