দেশের পল্লী-স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী মেঝেতে শুয়ে থাকার দৃশ্যকে অত্যন্ত ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্বাস্থ্য খাতকে ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ ও জোড়াতালির নীতিতে চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন প্রজেক্টের চেয়ে বিদ্যমান জনবল ও লজিস্টিক সংকট দূর করে হাসপাতালগুলোর মান ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় জরুরি। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া সংসদের বৈঠকের এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। ড. শফিকুর রহমান বলেন, চলমান বাজেট অধিবেশনে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। দেশের বাজেট হতে হবে ইনসাফভিত্তিক, যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ ও অঞ্চলের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে তার বড় ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজে উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব। পদ্ধতিগতভাবে কোনো একটি এলাকা থেকে এই অসততা ও স্বচ্ছতার অভাব দূর করার উদ্যোগ নিলে তবেই জাতি এর সুফল পাবে। প্রযুক্তির সহায়তায় অন্তত ২০ দিন আগে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া যায়, সেখানে তিন মাস আগের সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের মাধ্যমে বাজেটের অপচয় ও লুটপাটের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার নিজে সৎ এবং সদিচ্ছাসম্পন্ন হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তাদের তিন জায়গায় ট্যাক্স দিতে হবে না। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা সরকারি কোষাগার ছাড়াও অসৎ কর্মকর্তা এবং চাঁদাবাজদের পকেটে কর দিতে বাধ্য হন। ব্যবসায়ীদের যদি নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে কর শুধু একটিই হবে এবং বিপদে রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে, তবে সৎ ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে আরও বেশি কর দেবেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ বছরে মাত্র গুটি কয়েক অসৎ ও লুটেরা ব্যবসায়ীর হাতে দেশ লুণ্ঠিত হয়েছে, যাদের আমরা সবাই চিনি কিন্তু অনেকেই তাদের সাথে গলাগলি করি। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এই বাজেটে নেই। পাচার হওয়া এই বিপুল অর্থের মাত্র নয় ভাগের এক ভাগ যদি আগামী অর্থ বছরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে দেশে কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। শুধু অর্থ ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়, বরং এই অপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ডাকাত তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়া যেন কচ্ছপ গতিতে না চলে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে দ্রুত আইনি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করার জোর তাগিদ দেন তিনি। ক্ষমতার পালাবদল কখন কার মাধ্যমে হবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে বিরোধী দল হিসেবে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মহলে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত আছেন। দেশের স্বাস্থ্য খাতের কড়া সমালোচনা করে চিকিৎসা শাস্ত্রের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থা অত্যন্ত করুণ, যা সাধারণ মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছে। ভিআইপিরা সিএমএইচ-এ চিকিৎসা পাওয়ায় সাধারণের দুর্ভোগ হয়তো তাদের অনুধাবন করা কঠিন। দেশের পল্লী-স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে। হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীদের এই দৃশ্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হলেও মানবিক কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ফিরিয়ে দিতে পারছে না। নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরির চেয়ে বিদ্যমান লজিস্টিক সাপোর্ট, জনবল সংকট দূর করা এবং সেবা কেন্দ্রগুলোর মান উন্নত করার প্রতি সরকারকে নজর দিতে হবে। আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তমানে কেবল বিদেশের ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ বা অন্ধ অনুকরণে চলছে, যেখানে কোনো নিজস্ব উদ্ভাবন বা মিশন নেই। জোড়াতালি দিয়ে চলা এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে শতভাগ ক্লিনিক্যাল ও পেশেন্ট-ওরিয়েন্টেড চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি: এদিকে, দেশের কওমি ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি জানান ডা. শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং দেশের যোগ্য সব নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ দেওয়ার দাবিও জানান তিনি। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে বৈশ্বিক ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখতে পারছে না। ১৮ কোটি মানুষের দেশে অসংখ্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বিশ্ব র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো সম্মানজনক অবস্থান নেই; বরং দেশ দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা মিশনের অভাব। দক্ষ ও যোগ্য মানুষকে মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক প্রাধান্য ও ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্যও বাজেটে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি অনুদান নিলে শিক্ষার মৌলিকত্ব ক্ষুণ্ন হবেÑ কওমি ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন একটি আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের উচিত তাদের সম্মিলিত সংস্থা হাইয়াতুল উলইয়ার (আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কাওমিয়া বাংলাদেশ) সঙ্গে বসে নিশ্চয়তা দেওয়া যে, তাদের পরামর্শ অনুযায়ীই এটি পরিচালিত হবে। তাহলে একটি পথ বের হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের যে হক রয়েছে, তা বুঝিয়ে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে জুলুম না করে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে একটি নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে মান যাচাই করে দ্রুত এমপিওভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের যোগ্য সব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, উন্নত দেশের মতো বিত্তবানদের জন্য বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত সরকারি শিক্ষা নিশ্চিত করা পুরোপুরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত। তিনি পাহাড়ের অনগ্রসর ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ে আর কোনো দেশপ্রেমিক সেনা সদস্যকে প্রাণ হারাতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাধর্মী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি অন্তত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট ও অতিরিক্ত তহবিল দিয়ে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেন, যাতে দেশ চিরকাল আমদানিনির্ভর না থেকে নিজস্ব পণ্য রফতানির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল খুলে দেওয়ার আহ্বান: বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ রাখায় প্রায় ৭৫০ জন মেডিকেল ও সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর অ্যকাডেমিক জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কেবল বই পড়ে কেউ ডাক্তার বা নার্স হতে পারে না, তাদের জন্য ব্যবহারিক শিক্ষা ও রোগী অপরিহার্য। হাসপাতালের কোনো দুর্বলতা থাকলে তা তদন্ত ও শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি মানবিক ও যৌক্তিক কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় অতি দ্রুত আদ-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ডা. শফিকুর রহমান দেশের স্বাস্থ্য খাতকে একটি মানবিক ও ‘মিশনারি’ মডেলে রূপান্তর করার ওপর জোর দেন। দেশের চিকিৎসকদের প্রতিভার প্রশংসা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোর পরিদর্শনে রেগুলারেটরি সংস্থাগুলো যতটা কঠোর ও তৎপর, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ততটাই নিষ্ক্রিয়। সরকারি খাতে বড় কোনো অপরাধ বা গাফিলতি হলেও সবাই বহাল তবিয়তে পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধ যেখানেই হোক, সরকারকে দুই খাতকেই সমান চোখে দেখতে হবে। সম্প্রতি বন্ধ হওয়া আদ-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থাকলে তার তদন্ত হোক এবং দোষীদের শাস্তি হোক, এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই হাসপাতালের সঙ্গে প্রায় ৭৫০ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত। এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা থেকে দেশ প্রচুর রেমিট্যান্স অর্জন করছে বলেও উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মাঝপথে হাসপাতাল বন্ধের মতো সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখাবে না। তাই ‘মানবিক ও যৌক্তিক কারণে’ অতি দ্রুত আদ-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
হাসপাতালের মেঝেতে রোগীর শুয়ে থাকার দৃশ্য লজ্জাজনক: জামায়াত আমির
