ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির কারণেই বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকট: প্রতিমন্ত্রী

রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের জন্য সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতিই দায়ী। বর্তমান সরকার সেই সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ খাতের অগ্রাধিকার, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ, মিটার ভাড়া এবং জুন ২০২৬ সালের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম উপস্থিত ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র সাড়ে চার মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আগের সরকারের ভুল নীতির প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়া, পরনির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। বিএনপি সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতের কী চিত্র রেখে যেতে চানÑ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের মূল কারণ আগের সরকারের ভুল নীতি। এটি বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এখন সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ‘ভুল নীতি’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি করা হয়েছে। ফলে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে করা কয়েকটি চুক্তিতে রাষ্ট্রের স্বার্থ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। এসব চুক্তি বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেমন চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করেছে, বর্তমান সরকারও একই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। চুক্তিগুলো সংশোধনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় চুক্তি পরিবর্তন করা সহজ নয়। আইনি ও চুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ধাপে ধাপে ট্যারিফ পুনর্র্নিধারণ করা হচ্ছে। গত মাসেও কয়েকটি ক্ষেত্রে ট্যারিফ সংশোধন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো অভিযোগ বা তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার বক্তব্য নেওয়া হলে বিভ্রান্তি কমবে। এটি কোনো ধরনের হুমকি নয়, বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ। হটলাইন নম্বরে সেবা না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজধানী ও গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈষম্যের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় চাহিদা ও গুরুত্ব তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কিছু বাস্তবতা রয়েছে। তবে সরকার শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের বৈষম্য কমাতে কাজ করছে। তিনি জানান, গত ২৮ জুন দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। লোডশেডিং প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পুরোপুরি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে সেখানে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব কেন্দ্র দীর্ঘ সময় একটানা চালানোর উপযোগী নয়। তাই মাঝেমধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। বাংলাদেশ গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) সেপ্টেম্বরের মধ্যে চলমান উন্নয়নকাজ শেষ করতে পারলে এ সংকট অনেকটাই দূর হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের মেয়াদ শেষে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এদিকে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের পরও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, অতীতের কিছু ভুল নীতির কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৭ থেকে ১৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। জুন মাসের বিল জুলাইয়ে আদায় হবে, ফলে এর আর্থিক প্রভাব আগস্ট থেকে দেখা যাবে। তখন অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে আরও জ্বালানি সংগ্রহ করা সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো যাবে। বিপিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের অন্যান্য ব্যয়ও বহন করতে হয়। গাজীপুর কোর এলাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে সঞ্চালনগত কিছু সমস্যা রয়েছে। পিজিসিবির চলমান উন্নয়নকাজ শেষ হলে এসব এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী আরও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।