নুসরাত হত্যা মামলায় ঢালাও ফাঁসিরা রায় দেওয়া বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিলেন হাইকোর্ট

বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় নির্বিচারে সব আসামিকে ফাঁসির রায় দেওয়ায় ফেনীর তৎকালীন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ওই সময়ের বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত বলেছেন, বিচারিক আদালত এভাবে নির্বিচারে ফাঁসি দিতে গিয়ে যেভাবে প্রতিটা পরিবারের ওপর একটা ডিভাস্টেটিং ইফেক্ট (বিপর্যয়) নেমে এসেছে, এই জন্য তার বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হলো। বহুল আলোচিত এই মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তারা হলোÑ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলো- উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ ও ইফতেখার হোসেন রানা। খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন- মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, আফসার উদ্দিন, মাকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরীফ, ইমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল এবং কামরুন নাহার মনি। আদালতে আসামিদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এস এম মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির, অ্যাডভোকেট আব্দুল মোমিন, অ্যাডভোকেট আদনান ইয়াজদানী ও ব্যারিস্টার আল মামুন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির। এদিকে, হাইকোর্টের রায়ের পর নুসরাতের মা শিরিন আক্তার সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, নুসরাতকে হারানোর বেদনা এখনও তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বিচারিক আদালতে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। উচ্চ আদালতের রায়েও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। শিরিন আক্তার বলেন, নুসরাতকে হারানোর পরও পরিবারের অন্য সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা শঙ্কায় রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন বলে জানান তিনি। পরিবারের নিরাপত্তায় সরকারের কাছে জোর দাবি জানান নুসরাতের মা। মামলার বাদী ও নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসানও হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।তবে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তাদের পরিবার উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে রায় ঘোষণার পর সোনাগাজীর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় পর উচ্চ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ও খালাসের সিদ্ধান্ত আসায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাদের মনে রয়েছে। এমন ঘটনা যাতে আর কোনো শিক্ষার্থী বা পরিবারের সঙ্গে না ঘটে, সে জন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সোনাগাজী মডেল থানার ওসি আবুল হাসেম বলেন, নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তায় গতকাল (গত রোববার) থেকে তাদের বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিবারের নিরাপত্তায় সব সময় পুলিশ পাশে থাকবে। হাইকোর্টের রায়ের পর নুসরাত হত্যা মামলার আইনি প্রক্রিয়া নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রায়কে ঘিরে সোনাগাজীতে আলোচনা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।