দেশ ও দেশের মানুষ ভালো নেই: জামায়াত আমির

দেশের মানুষ ভালো নেই, দেশ ভালো নেই। বিদ্যুৎ ও সারসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। মানুষ কষ্টে আছে। আমরা জাতীয় সংসদে জনগণের এই কষ্টের কথা বলার চেষ্টা করলেও সরকার আমাদের কথা বলতে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আমরা রাজপথে নেমেছি। গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বগুড়ার ধুনট উপজেলায় এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এসব কথা বলেছেন। এর আগে তিনি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের নেতা শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন। কবর জিয়ারত শেষে তিনি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় শহীদ আব্দুল মালেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। জামায়াত আমিরের আগমন উপলক্ষে স্থানীয় মাদরাসা মাঠে সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি চলমান বিদ্যুৎ ও সারসংকটের কড়া সমালোচনা করেন এবং বিরোধী দলকে সংসদে কথা বলতে না দেওয়ার অভিযোগ আনেন। এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, ধুনট উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে গতকাল শনিবার বেলা পৌনে ১১টায় বগুড়া সার্কিট হাউজে জেলা ও মহানগরে কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় বিদ্যুৎ ও সার সংকট নিরসন, পোশাক খাতের সমস্যা সমাধান, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত অবহেলিত বগুড়ার সার্বিক উন্নয়নে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। মতবিনিময় সভায় অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও শিল্প খাতের সংকট তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, মালয়েশিয়া বা জাপানের মতো দেশগুলো স্বাধীনতার পর স্বল্প সময়ে অভাবনীয় উন্নতি করলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমাদের অবকাঠামো ও শিল্পখাত পিছিয়ে আছে। বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক খাত মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। বিদ্যুৎ ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পোশাক খাতের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বায়াররা অন্য দেশের দিকে চলে যাচ্ছে। এই সংকট কাটাতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেওয়া সহায়তার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, দেশকে ভালোবাসার জায়গা থেকেই আমরা দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি টিমের মাধ্যমে সরকারকে বিনামূল্যে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সংকটের কথা স্বীকার না করে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়েছে। বাধ্য হয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, বেপরোয়া দলীয়করণ বন্ধ, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি প্রতিরোধ, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন ও লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছি। বগুড়া অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সার্বিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া হচ্ছে উত্তরবঙ্গের নাভি ও সাত মাথার ঐতিহাসিক সংযোগস্থল। এটি আগে একটি মিনি শিল্পনগরী ও এডুকেশন ভিলেজ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরে একটি মেডিকেল কলেজ ছাড়া শিক্ষার বড় কোনো অগ্রগতি এখানে হয়নি, শিল্পকারখানাও টিকে থাকেনি। আজ ধুনট যাওয়ার পথে রাস্তার যে জরাজীর্ণ চিত্র দেখলাম, তাতে স্পষ্ট যে এটি কতটা উপেক্ষিত। আওয়ামী লীগসহ বিগত কোনো সরকারই বগুড়াকে তাদের প্রাপ্য উন্নয়ন দেয়নি। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বগুড়ার অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেমন সারা বাংলাদেশ দেখবেন, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সারা দেশের মানুষের অধিকারের চৌকিদারি ও পাহাদারি করার দায়িত্ব আমার। ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা কিংবা তিস্তা পাড়ের মানুষের অধিকার নিয়ে যেমন সংসদে কথা বলেছি, তেমনি বগুড়া যেন আলোচনার আগেই তার ন্যায্য পাওনাটুকু পেয়ে যায়-সে জন্য আমরা রাজপথ ও সংসদে আমাদের জোর দাবি বজায় রাখব। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটে ৮২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় এসেই সে ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। সত্তরের নির্বাচনে জনগণের রায় অমান্য করার পরিণতি শুভ হয়নি-ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করা উচিত। সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে জামায়াত আমির বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। সাংবাদিকরা সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ থাকলে অন্য সব বিভাগ সঠিকভাবে চলতে বাধ্য হয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সাংবাদিকদের ইতিবাচক দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানাই। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর ও জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।