ইউরোপীয় বাজারে কমছে রপ্তানি, পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক বড় ধরনের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ায় শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা চাহিদার পতন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী প্রবেশের কারণে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০২৬ সালের শুরুতে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ছে। তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ যোগান দেয়। এই খাতের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান। অর্ডার কমে গেলে ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ এবং শ্রমিকদের আয় হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৫ শতাংশের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪৩ বিলিয়ন ইউরোতে, যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে রপ্তানি ছিল ১.৯১ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন ইউরো কমেছে। এই পতনের পেছনে দুটি বড় কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, রপ্তানির পরিমাণ কমেছে-২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ১২৬.৮০ মিলিয়ন কেজি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কমে দাঁড়িয়েছে ১০৪.৬৩ মিলিয়ন কেজিতে। দ্বিতীয়ত, গড় ইউনিট মূল্যও কমেছে-২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ছিল ১৫.০৮ ইউরো, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কমে দাঁড়িয়েছে ১৩.৬৬ ইউরোতে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একসঙ্গে দুটি চাপের মুখে পড়েছে-অর্ডার কমছে, আবার ক্রেতারা কম দামে পণ্য চাইছেন। ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা চাহিদার পতন এবং খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানিও কমেছে-২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৮.৩২ বিলিয়ন ইউরো থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭.০৩ বিলিয়ন ইউরোতে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণও কমেছে ৮.৩৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৭.৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিকভাবেই পোশাক আমদানিতে সংকোচন দেখা যাচ্ছে। শিল্প নেতারা বলছেন, ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন কম দামে পণ্য চাইছেন। এতে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনের শর্ত দিচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক কারখানা এখনও সেই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলো যেমন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান বাজার দখল করছে। আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যায়, ভিয়েতনাম ইউরোপে রপ্তানি বাড়িয়েছে ১২ শতাংশ, কম্বোডিয়া ৮ শতাংশ, পাকিস্তান ৬ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ কমিয়েছে ২৫ শতাংশ। এর কারণ হলো ট্যারিফ চাপ, বাজার সংকোচন এবং মানোন্নয়নে পিছিয়ে থাকা। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর অবস্থাও দুর্বল। চীনের রপ্তানি আয় কমেছে ৬.৯০ শতাংশ, তবে ভলিউম বেড়েছে ১.২১ শতাংশ। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ২৯.১২ শতাংশ, ভারতের কমেছে ১৫.২৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের কমেছে ৭.৩৪ শতাংশ, কম্বোডিয়ার কমেছে ২৫.১১ শতাংশ, পাকিস্তানের কমেছে ১৭.০৬ শতাংশ, মরক্কোর কমেছে ১৫.১৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার কমেছে ২৬.০৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার কমেছে ১৯.৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ ইইউ বাজারে সংকোচন প্রায় সব বড় সরবরাহকারী দেশকেই প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো স্বল্পোন্নত দেশ (খউঈ) থেকে উত্তরণ। যদিও বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই এটি পেছানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তা করা সম্ভব না হলে ২০২৬-২০২৭ সালে বাংলাদেশ এই সুবিধা হারাবে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক বাড়বে। এতে বাংলাদেশের পোশাক আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। ক্রেতারা তখন অন্য দেশ থেকে পণ্য নিতে আগ্রহী হবেন। এর প্রভাব শুধু রপ্তানি আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রা, পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সবই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। অর্ডার কমে গেলে ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ এবং শ্রমিকদের আয় হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অনেক শ্রমিক অতিরিক্ত সময় কাজের সুযোগ হারাচ্ছেন। তাদের আয় কমে যাচ্ছে। ফলে পরিবারগুলো সংকটে পড়ছে। সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার বৈচিত্র্য জরুরি। ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার খুঁজতে হবে-জাপান, অস্ট্রেলিয়া, লাতিন আমেরিকা। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে, যাতে ইউরোপীয় ক্রেতাদের আস্থা ফেরানো যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে, যাতে শুল্ক সুবিধা বজায় থাকে। প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। এদিকে, ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ছে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা হারাবে। শিল্প নেতারা সতর্ক করেছেন, এখনই বাজার বৈচিত্র্য, টেকসই উৎপাদন, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।