জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় গত মঙ্গলবার বিকেলে এ আপিল আবেদন জমা দেওয়া হয় বলে এফএনএসকে তার আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হাসানুল হক ইনুর পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে খালাস চেয়ে আপিল করা হয়েছে। এর আগে গেল ৫ অক্টোবর ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি গাজী এম এইচ তামীম বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের সাজাকে ‘অপর্যাপ্ত মনে করায়’ প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। এতে ১১টি গ্রাউন্ড বা যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। আপিলটি গ্রহণ করে ইনুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার’ আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ইনুর খালাস পাওয়া কয়েকটি অভিযোগেও সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে জানিয়ে তামীম বলেন, “শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জুরিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী অপরাধের ভয়াবহতা, গভীরতা এবং ‘স্কেল অব দ্য অ্যাটাক’ বিবেচনা করতে হয়। “কত মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, কতজন নিহত ও আহত হয়েছেন এবং এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সমাজের প্রত্যাশা কী-এসব বিষয়ও আপিলে তুলে ধরা হয়েছে।” প্রসিকিউশনের ভাষ্য, ট্রাইব্যুনাল ইনুর বিরুদ্ধে দেওয়া পর্যবেক্ষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথোপকথন, আন্দোলন দমনে পরামর্শ, কারফিউ জারি এবং আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তারের পরামর্শ দেওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। এসব কর্মকাণ্ডকে সত্য বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পরও ইনুকে ১০ বছরের সাজা দেওয়ার বিষয়টি ওই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ বলে মনে করছে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলা বৃত্তান্ত গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। প্রতিটি অভিযোগে ১০ বছর করে সাজা হলেও তা যুগপৎ বা একই সময়ে কার্যকর হওয়ায় তাকে মোট ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে। দুটি অভিযোগে তাকে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেয় আদালত। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় দেয়। ইনু ছিলেন এ মামলার একমাত্র আসামি। মামলায় তার বিরুদ্ধে উসকানি, ষড়যন্ত্র, সহিংসতা, নিপীড়ন এবং জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগসহ আটটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। তৃতীয় অভিযোগে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে শনাক্ত করা এবং তাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয় রায়ে। ষষ্ঠ অভিযোগে আন্দোলন দমনে রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের মাধ্যমে ভূমিকা রাখার অভিযোগ এবং সপ্তম অভিযোগে ৪ আগস্ট কারফিউ ও আন্দোলন দমনে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। এই দুই অভিযোগেও ট্রাইব্যুনাল তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। অন্য পাঁচটি অভিযোগে তাকে খালাস দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় ছয়জনের হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও ছিল। গত ২০ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী, রায়ের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। ২১(৪) ধারায় আপিল দায়েরের পর ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে ইনুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
ইনুর সাজা কমিয়ে খালাস চেয়ে আপিল
