সংসদে সংবিধান সংস্কার না হলে জনগণের কাছেই যাবো: জামায়াত আমির

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে সংস্কার সনদ (চার্টার) তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারে সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাবেন এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি। গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ৩১টি রাজনৈতিক সংগঠন একটি সংস্কার সনদে একমত হয়। তার দাবি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছাড়া বাকি সব দল ওই সনদে স্বাক্ষর করেছে। তিনি বলেন, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। গণভোটে যে রায় আসবে, তা সবাই মেনে নেবে বলেও অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেই রায়ের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেন, বিরোধী দলের সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নিলেও সরকারি দলের সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সরকারের যুক্তি ছিল, বিষয়টি সংবিধানে নেই। তিনি বলেন, সংবিধানে অনেক বিষয়ই আগে ছিল না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনও সংবিধানে ছিল না। অতীতে অনুষ্ঠিত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গণভোটও সংবিধানে ছিল না। কিন্তু জাতীয় প্রয়োজনেই সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমানের দাবি, গণভোটে প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু সেই রায় উপেক্ষা করে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হলেও কার্যকর আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে নোটিশের মাধ্যমে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত বা রুলিং আসেনি। তাই সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দল। তিনি বলেন, আমরা জনগণকে দেওয়া ওয়াদা থেকে সরে যাব না। সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের পার্লামেন্টে যাব। জনগণের দাবি নিয়েই আমাদের আন্দোলন চলবে সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণ সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, সংস্কারের জন্য রায় দিয়েছে। সংস্কার ও সংশোধনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের বিষয় আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়ে, কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে হওয়া সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও হাইকোর্ট বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে আদালতের রায়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই না কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন হোক। আমরা চাই জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়ন করা হোক। যেসব সংস্কার দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে, সেগুলোই বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় দেশ বারবার পথ হারাবে। তিনি বলেন, এ দাবিতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সময়ের সঙ্গে জনগণের অন্যান্য দাবিও কর্মসূচিতে যুক্ত হবে। এদিকে, ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৮৫ হাজার টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে হবেÑ এমন দাবি তুলেছিলাম সংসদে। এ কারণে অনেক সিন্ডিকেট আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়ে হুমকি দিচ্ছে। জনগণের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে কোনো সিন্ডিকেটের কোনো হুমকির তোয়াক্কা করবো না ইনশাআল্লাহ। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে বাজেট পরবর্তী মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। প্রবাসীদের পক্ষে সবসময় জোরালো বক্তব্য রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জামায়াতের আমির বলেন, আমরা এই দাবি ইনশাআল্লাহ জোরালোভাবে উত্থাপন করবো সংসদে। প্রবাসীদের ভোগান্তি নিয়ে আমরা কথা বলেছি, আপনারা দেখেছেন আজ খবর পেলাম যে একদল আমার বিরুদ্ধে খেপে গেছে। আমি কেন বললাম মালয়েশিয়ায় ৮৫ হাজার টাকায় লোক পাঠাতে হবে। দালাল যারা তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমি কি দালালের কোনো তালিকা দিয়েছি? আপনাদের জানামতে আমি কি কোনো সংস্থার কথা বলেছি? তাহলে কিছু লোকের গায়ে এত কষ্ট লাগে কেন? তিনি বলেন, এই সিন্ডিকেট শুধু মালয়েশিয়ায় নয়। সারা বিশ্বে আমাদের এই গরিব লোকগুলোকে নিঃস্ব করে দেওয়া হয়। এরপরে তারা প্রতারিত হয়। সেখানে আবার গিয়ে দেখা যায় যে তার ওই ভ্যালিডিটিটাও নেই, জেলে থাকে। তাহলে আমরা কি এগুলা নীরবে গিলবো আর হজম করবো? দেখতে থাকবো? না। এগুলার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। আমরা কী করতে পারবো, আমরা সংসদের ভিতরে চিৎকার দেবো, আওয়াজ তুলবো। যদি কেউ ভুলের মধ্যে থাকেন এতে তাদের সংশোধনের সুযোগ হবে। মুদি দোকানের কর প্রত্যাহার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গরিব মানুষ প্রান্তিক ব্যবসায়ী মুদি দোকানদার, তাদের উপরে উৎসে বা অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছিল। মানে প্রস্তাবনা এসেছিল। আমরা তার বিরুদ্ধে কথা বলেছি। এটাও আউট হয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ছিল। অর্থবছর প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা অর্থবছর পরিবর্তনের কথা বলছি। আমাদের দেশে একটা দানব আছে, উন্নয়নের দানব। এটা নয় মাস কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমায়। শেষের তিন মাস গা ঝাড়া দিয়ে চলে আসে। এসে এমন গতিতে কাজ শুরু করে, ঝড়ের গতি। নয় মাসে এডিপি ব্যয় ৪২ শতাংশ, অথচ তিন মাসে ৫০ শতাংশ। তখন কী হয়? বৃষ্টি ঝড়ে জনগণের টাকা পানির সঙ্গে মিশে যায়। লুটপ্ট, অপচয়, হজম। কেন এটা করতে হবে তার কোনো যৌক্তিকতা নাই। আমরা বলেছিলাম আমাদের আবহাওয়া এবং সিজন অনুযায়ী এটা হোক জানুয়ারির এক তারিখ থেকে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ। তাহলে অন্তত শেষ তিন মাসে দৈত্যের ঘুম ভাঙলেও আমাদের সম্পদ পানিতে ভেসে যাবে না। তিনি আরও বলেন, আপনারা দেখেছেন বিদেশ থেকে আনা সাইকেলের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের উপরে একটা ভালো ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব এসেছে। আমরা এটা তুলে দিতে বলেছিলাম। অর্থমন্ত্রী তার সমাপনী বক্তব্যে বললেন যে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেলে ভালো হতো। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। উনারা আশ্বাস দিলেন যে এখন তো আর এটা বিলে আনা যাচ্ছে না। জামায়াতের আমির বলেন, আমরা নির্বাচনের সময় দেশবাসীর সামনে ওয়াদা করেছিলাম, আমাদের কেউ নির্বাচিত হলে এমপি হোক মন্ত্রী হোক যাই হোক আমরা বিনা ট্যাক্সের গাড়ি কিনবো না। সরকারি কোনো প্লটের সুবিধা নেবো না। কিছু বন্ধু ওই গুড়ের সঙ্গে কিছু লবণ না ছিটাইলে আরাম পায় না। আমরা যা বলেছি স্পষ্ট বলেছি, অস্পষ্ট কোনো কথা বলিনি। এখানে লাগায়ে দিছে ফ্ল্যাট নিবো না, এখন সরকারি ফ্ল্যাট এমপিদের জন্য ডেজিগনেটেড। এটা সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য। এটা কি সরকার আমাকে দিয়ে দিচ্ছে নাকি? ওইটা যত সময় সংসদ কার্যকর থাকবে তত সময় উনি এটা ব্যবহার করবেন। সরকারি দল, বিরোধীদল সবাই ব্যবহার করবে। যখন সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে তখন আর কেউ এক সেকেন্ড এখানে থাকার কোনো নৈতিক এবং বৈধ অধিকার নাই। ছেড়ে দিতে হবে। এটাকে নিয়ে আবার বিভিন্ন ধরনের জল ঘোলা করা হয়। তিনি বলেন, আমরা আরও বলেছিলাম সরকারি সুযোগ সুবিধা যতটা না নিলে না হয় আমরা চেষ্টা করবো। কিন্তু কেউ যদি এটা নিতে চায় এখানে কোনো অপরাধ নাই। তা আমরা সেটা রক্ষা করে চলার চেষ্টা করছি। এই যে বাজেটটা এসেছে, বলা হচ্ছে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট। কিন্তু আমরা যদি মানি অ্যান্ড মার্কেট ইনফ্লেশনের কথা চিন্তা করি তাহলে এটাকে বড়, সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট বলা যাবে না। অনেকটা বাজারের সঙ্গে এটা সংগতিপূর্ণ। বড় বাজেট করা কোনো অপরাধ নয়। একটা জাতির মিশন থাকলে বড় বাজেট লাগবে। চ্যালেঞ্জটা কয়েক জায়গায়, একটা হলো বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা। এর চাইতে বড় হলো দুর্নীতি। এই দুই জায়গায় যদি বড় সংস্কার আনা না যায়, বাজেট হবে কিন্তু বাজেটের প্রকৃত সুফল জনগণ পাবে না। এই বাজেট থেকেই তো ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে চলে গেছে। যদি এই দুই জিনিসের সংস্কার না হয় আবার যাবে। এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা শুধু এনবিআরের না। এনবিআর আমাদের কালেক্টর। কিন্তু এক্সিকিউশন তো এক্সিকিউটিভ ডিপার্টমেন্টেরর ওপর। এর সঙ্গে একদম প্রান্তিক লেভেলে গ্রামের একজন ওয়ার্ড মেম্বার এবং কোনো প্রজেক্ট হয়ে থাকলে সেই প্রজেক্টে জড়িত। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আজাদ, শাহজাহান চৌধুরী, সাইফুল আলম খান মিলন, রফিকুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম বুলবুল, শফিকুল ইসলাম, সাইদউদ্দিন আহমদ হামজালা ও রাশেদুল ইসলাম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এস মাহমুদ জুবায়ের, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি সেলিম উদ্দিন এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। সভা পরিচালনা করেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।