ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র বিক্রেতা ‘হামিদুল হক আর্মস অ্যান্ড কোং’র মালিক মাজেদুল হক ওরফে হেলালকে তিনদিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল বুধবার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান রিমান্ডের তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে, গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের চকবাজার থানার হারেছ শাহ মাজার লেন থেকে হেলালকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। গতকাল বুধবার হেলালকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর কাদির ভূঁঞা। পরে তিনি সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, হাদি হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল) নরসিংদী এলাকা থেকে জব্দ করা হয়। এই ঘটনায় নরসিংদী থানার অস্ত্র আইনে মামলা হয়। এই আগ্নেয়াস্ত্র এবং এ মামলার ঘটনাস্থল থেকে জব্দ হওয়া কার্তুজ, বুলেট ও আগ্নেয়াস্ত্র ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে পিস্তলটি থেকেই ফায়ার করা হয়েছে। এছাড়া মাইক্রো অ্যানালাইসিস পরীক্ষায় পিস্তলের সিরিয়াল নম্বরটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তদন্তকালে জানা যায়, জব্দ করা পিস্তলটি ঢাকার এম আইচ আর্মস কোং আমদানি করে। পরবর্তীতে চকবাজারের ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্সের নিকট ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর বিক্রি করে। এরপর ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্স ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের হামিদুল হক আর্মস অ্যান্ড কোংয়ের কাছে বিক্রি করে। তদন্ত করে জানা যায়, এই দোকানের মালিক আসামি মাজেদুল হক হেলাল। এই লাইসেন্সটি পূর্বে তার বাবা হামিদুল হকের নামে ছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে লাইসেন্সটি তার নামে করে নেয়। তার লাইসেন্সটি ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবায়নকৃত ছিল। পরে আর নবায়ন করেনি। লাইসেন্স নবায়ন না করেই ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্স দোকান থেকে এই অস্ত্রটি ক্রয় করে নিয়ে যায়। এমতাবস্থায় অস্ত্রটি মো. মাজেদুল হক হেলালের কাছ থেকে আসামিদের হাতে কীভাবে গেল সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আসামির নাম ঠিকানা যাচাই-বাছাই চলছে। মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জন্য সাতদিনের রিমান্ডের প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন অর রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এটা একটা আলোচিত ঘটনা এবং মামলা। যার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশে আজও আলোচনা, আন্দোলন চলমান। হাদি হত্যায় এ অস্ত্র কিভাবে ফয়সাল করিমের কাছে গেল তা জানার জন্য তার সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। সর্বোচ্চ রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি। হেলালের পক্ষে কোনও আইনজীবী ছিলেন না। কিছু বলতে চান কি না আদালতের প্রশ্নে হেলাল বলেন, ‘না’। পরে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়। জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসা হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগের সময় চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরে এতে হত্যা (৩০২ ধারা) যুক্ত করা হয়। মামলার তদন্ত শুরুতে থানা পুলিশ এবং পরে ডিবি পুলিশের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করাও হামলার উদ্দেশ্য ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
হাদি হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র বিক্রেতা হেলাল রিমান্ডে
