অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বহুমুখী চাপের কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এর প্রভাবেই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি আবারও বাড়তির দিকে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঝুঁকিমুক্ত এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মুনাফার কারণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্র সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা ব্যাংক বা পুঁজিবাজারে আস্থা হারিয়েছেন, তারা এই খাতেই স্বস্তি খুঁজছেন।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই মাসে পূর্বে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ ও আসল পরিশোধের পরও সরকারের কোষাগারে এই পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। ফলে সরকার এই অর্থ উন্নয়ন ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করতে পেরেছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চিত্রও বিনিয়োগ প্রবণতায় বড় ভূমিকা রাখছে। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা প্রায় নয় মাস পর আবারও ৯ শতাংশের ঘরে ফিরে এসেছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও তা বাড়তির দিকে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে সাধারণত মানুষের সঞ্চয় কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা এবং পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার কারণে মানুষ খরচ কমিয়ে হলেও নিরাপদ সঞ্চয়ের পথ খুঁজছে। এই বাস্তবতায় সঞ্চয়পত্র তাদের কাছে একটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর পেছনে সুদহারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিক্রি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত বছরের শুরুতে সরকার সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বাড়িয়েছিল। তখন মেয়াদভেদে সর্বোচ্চ সুদহার দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশে। জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফাও বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ করা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে এই হার কিছুটা কমিয়ে আনা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয় ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। যদিও ডিসেম্বর শেষে আরও এক দফা সুদ কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাতিল করা হয়। ফলে বর্তমানে আগের নির্ধারিত হারই বহাল রয়েছে।
সরকারের ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনাতেও সঞ্চয়পত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাত থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
এর আগের দুই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ঋণাত্মক, অর্থাৎ সুদ-আসল পরিশোধের পর সরকার নতুন করে তেমন অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক দাঁড়ায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকার বেশি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। তবে তার আগের বছরগুলোতে চিত্র ভিন্ন ছিল-২০২১-২২ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল প্রায় ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে তা ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা পুরোপুরি কমেনি। বরং যারা কিছুটা সঞ্চয় করতে পারছেন, তারা ঝুঁকিমুক্ত খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং শেয়ারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে মানুষ বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, তুলনামূলকভাবে সঞ্চয়পত্রে এখনো ভালো মুনাফা পাওয়া যায়, যা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। ফলে এটি ধীরে ধীরে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায়ও সঞ্চয়পত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতি বছরই বাজেটে বড় ঘাটতি রাখা হয়, যা পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হয়। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাতের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে-পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এই চারটি পণ্যের মাধ্যমেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক খাত গড়ে তুলতে সব খাতেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
