দেশে বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তবে গ্রীষ্মকালে জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সময় প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। ফলে তখন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয় না। লোডশেডিং কমাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সঞ্চালন ও বিতরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে নেওয়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহারে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-এসি’র তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং ব্যবহার শেষে সুইচ বন্ধ করা। এছাড়া পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে পানির পাম্প, ওভেন, হিটার, ইস্ত্রি, ওয়াশিং মেশিন ও ওয়েল্ডিং মেশিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। শপিংমলে অতিরিক্ত আলো ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ভিজিল্যান্স টিম কাজ করছে। মন্ত্রী আরও জানান, অটোচার্জিং স্টেশনগুলোকে পিক আওয়ারে চার্জিং বন্ধ রাখতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে: দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবুর এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এ কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশীয় উৎস হতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিকল্পে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী ১ বছরে মোট ১১৭টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে পেট্রোবাংলা কর্তৃক গৃহীত অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের অগ্রগতি ও গ্যাস মজুদ সংক্রান্ত তথ্যাদি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২০২২ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৫টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬: উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির আওতায় স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ ও ‘অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সম্ভাব্য নতুন গ্যাস মজুদ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, পেট্রোবাংলা কর্তৃক গৃহীত কর্মপরিকল্পনার আওতায় সব কূপ খনন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলে আনুমানিক ১,৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে।
দিনে গড়ে ১৪৫০০ থেকে ১৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে: বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মদের এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী এসব কথা জানান। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বর্তমানে সারাদেশে (ক্যাপটিভ, আমদানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নেটমিটারিংসহ) সর্বমোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। তন্মধ্যে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার উল্লেখিত কার্যক্রম গ্রহণ করছে। এগুলো হলো- বিদ্যুৎখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গ্রহণ; বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বহুমুখীকরণ; বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ; সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন; বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ/উন্নয়ন; জ্বালানি সাশ্রয়ে গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে (লিফলেট, ভিডিও) প্রচারণা; হলি-ডে স্ট্যাগারিং এবং ডিমান্ড সাইড ও সাপ্লাই সাইড ম্যানেজমেন্ট; নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া; বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ; নিবিড় তদারকির মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রকল্পসমূহ যথাসময়ে বাস্তবায়ন; প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যাসমূহ দ্রুত চিহ্নিত করে তার সমাধান করা।
আদানির সঙ্গে চুক্তি সংশোধন বিবেচনাধীন: ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অস্বাভাবিক মূল্যে করেছে, আলোচনাক্রমে এ চুক্তি সংশোধনের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এ কথা জানান। ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ভারতের আদানি পাওয়ার (ঝাড়খন্ড) লিমিটেড এর সাথে ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ ক্রয়ের যে চুক্তি হয়েছিল উক্ত চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত একটি জাতীয় কমিটি কর্তৃক পর্যালোচনা করা হয়েছে। উক্ত কমিটিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ছিলেন এবং কমিটি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণ করেছে। তিনি আরও বলেন, পর্যালোচনায় আদানি পাওয়ারের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে মর্মে জাতীয় কমিটি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে উক্ত চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়া অথবা আদানি পাওয়ার এর সাথে আলোচনাক্রমে চুক্তি সংশোধন ইত্যাদি বিষয়সমূহ সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ ঘাটতি নেই: জ্বালানি মন্ত্রী
