নানা রোগে আক্রান্ত জামালপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল

মোহাম্মদ আলী
দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ঔষধ পথ্যের অপ্রতুলতা, জনবল সঙ্কট, রোগী ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম, ডাক্তার কর্মচারীদের সেচ্ছাচারীতাসহ নানা রোগে জড়জড়িত জামালপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল! রোগগুলো চিহ্নিত করে তা সারিয়ে তোলার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না? তা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর মিলেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
গত ১ এপ্রিল থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত আজকের জামালপুর এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি তৈরিতে আমাদের প্রতিবেদক কথা বলেছেন, হাসাপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, তাদের স্বজন, ডাক্তার, কর্মচারী ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর সাথে।
তাতে জানা যায়, জামালপুর ছাড়াও শেরপুর, কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের জেলার সীমানা ঘেঁষা এলাকার মানুষের সরকারি স্বাস্থ্য সেবার ভরসাস্থল জামালপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালটি। বর্তমানে নানা কারণে এখানে কাঙ্ক্ষিত বা আশানুরূপ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না সেবা প্রত্যাশীরা। ধারণ ক্ষমতার চাইতে বেশি রোগী, সে অনুপাতে নেই চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সঙ্কট, আছে ঔষধ ও পথ্যের অপ্রতুলতা। প্রাধিকার অনুযায়ী চিকিৎসক না থাকলেও যারা আছেন তাদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও সেচ্ছাচারীতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্নের তীর আউটডোরে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের প্রতি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সঠিক সময়ে গমনাগমন করলেও কেউ কেউ আবার যখন মন চায় আসেন, যখন চায় যান। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে হয় দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের।
ইনডোরে ভর্তি রোগীদের অবস্থা আরো করুণ। নতুন রোগীদের মিলে না বিছানারপত্র। কেউ কেউ মেঝেতেও ঠাঁই পায় না। অগত্যা কেউ কেউ শুয়ে থাকেন করিডোরে। অনেকে আবার বাহির থেকে মাদুর পাটি কিনে এনে বারান্দায় ভর্তি থাকছেন জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে! হাসপাতালে খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে অনেকের।
এছাড়া দীর্ঘদিনেও চালু হয়নি আইসিইউ ওয়ার্ড। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে সেবা নিতে আসা রোগী ও রোগী প্রতিনিধিদের। বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা মারামারিতে মারাত্বক আক্রান্ত বা হার্টঅ্যাটাক এবং ব্রেইন স্ট্রোকে জটিল রোগী হলেই রেফার প্রবণতা, বেশিরভাগ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকের জায়গায় রোগী দেখেন শিক্ষানুবিশ মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট, তাৎক্ষণিক সেবা নিতে গেলেও সামান্যই সুঁই, সুতা, সিরিঞ্জ কিনতে হয় রোগীদের। এতো সঙ্কট ও অপ্রতুলতার মাঝেও সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন কিছু ভালো চিকিৎসক।
হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা কক্ষগুলোতেও আছে রোগী হয়রানি ও ভোগান্তির আক্ষেপ । টেকনিশিয়ানদের দায়িত্বে পালনে গাফিলতি, ভূয়া রসিদ, রসিদবিহীন ফি আদায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেওয়া হয় অতিরিক্ত ফি। ল্যাবে ব্যবহৃত রিয়েজেন্ট ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করে কেউ কেউ হচ্ছেন লাভবান। যে পরীক্ষা হয় না নিয়মে সেই পরীক্ষাও হয় টাকা দিলে। এছাড়া নানা কৌশল বিল ভাউচারে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।
নিয়োগ, ক্রয়, সংস্কার ইত্যাদি দাপ্তরিক কাজেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর আছে স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে । আছে ডাক্তার ডাক্তারে মারামারির মামলা। আছে নার্স কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রোগী ও রোগী স্বজনদের অসৌজন্যমূলক ও অশালীন আচরণের অভিযোগ। পাশাপাশি শৃঙ্খরলা ভঙ্গ, নিয়মনীতি উপেক্ষা ও ডাক্তার কর্মচারীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণেরও পাল্টা অভিযোগ রয়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বয়াবহ অবস্থা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায়। প্রস্রাব, পায়খানা গোসলখানার দরজাগুলো ভাঙ্গা। কোনোটার দরজাই নেই। কোনোটাতে নেই বদনা। একজন প্রস্রাব পায়খানায় গেলে আরেকজনকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বদনার জায়গায় ব্যবহার হয় সেলাইনের পরিত্যক্ত বোতল, পানির বোতল, অষুধের কৌটা ইত্যাদি। গোসলখানা গুলোর একই অবস্থা। নোংরা, স্যাঁতস্যাঁতে ও দুর্গন্ধময়। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা মহিলা ওয়ার্ডগুলোতে।
এছাড়া ঔষধচোর, দালাল, ছিনতাই ও প্রতারকচক্রের দৌরাত্ম্য তো আছেই। এব্যাপারে জামালপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও জামালপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাধিকার অনুযায়ী কতজন ডাক্তার? কর্মরত আছেন কতজন? তাদের কতজন আবাসিক? অনাবাসিক কতজন? ভর্তি রোগীর সংখ্যা কত? কোন কোন ঐষধ বরাদ্দ রয়েছে? প্রতিজন ভর্তি রোগীর পথ্যের জন্য মাথাপিছু কতটাকা বরাদ্দ? খাদ্য তালিকায় রয়েছে কী কী? এসব জানতে ২দিন ঘুরেও জামালপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক, মোঃ মোখলেছুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। অফিস সূত্রে জানা গেছে তার অন্যত্র বদলি হয়েছে। তিনি সে বদলি ঠেকাতে তদবির নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাই, কয়েকদিন যাবত অফিস করছেন না!
এমন জটিল ও কঠিন নানা রোগে আক্রান্ত হাসপাতালটিকে সুস্থ ও সুন্দর করে তোলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ বা চেষ্টা রয়েছে কি না? জানতে হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক, ডাঃ মাহফুজুর রহমানের কক্ষে গেলে তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে বার বার চেষ্টা করলেও ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এসময় তার পিওন হামিদুল ইসলাম জানান, তার স্যার অসুস্থ। ফোন বন্ধ করে বিশ্রামে আছেন।