পর্যটকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে মোগাদিশু

ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি, সোনালি বালুর সৈকত আর শীতল সমুদ্রবাতাসে দুলতে থাকা নারকেলগাছÑপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন দৃশ্যই বিশে^র সামনে তুলে ধরতে চান সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর এক তরুণী। আত্মঘাতী বোমা হামলা, সংঘাত আর অস্ত্রধারী তরুণদের পরিচিতির বাইরে নিজের শহরের সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তিনি। ২৩ বছর বয়সী সুদি আবদুল ফাত্তাহ আবদুল খাদের স্থানীয় পর্যটক গাইডদের একটি দলের সদস্য। পর্যটকদের নিয়ে তিনি ঘুরে দেখান শহরের দর্শনীয় স্থান, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমুদ্রসৈকত ও স্থানীয় বাজার। তার প্রিয় জায়গা জাজিরা সৈকত। সেখানে সমুদ্র উপভোগের পাশাপাশি কাছের বালিয়াড়িও (সমুদ্র সৈকতে বালু জমে উঁচু ঢিপি বা বালির পাহাড়) ঘুরে দেখেন পর্যটকেরা। সুদির ভাষায়, জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। বালিয়াড়িগুলো দেখে অনেকের সাহারা মরুভূমির কথা মনে পড়ে। তবে তার ভ্রমণ আয়োজন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটকদের নিয়ে যান মাছের বাজারে। সেখানে সোমালিয়ার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ সম্পর্কে ধারণা পান তারা। এ ছাড়া একসময় ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মোগাদিশুর ঐতিহাসিক এলাকাও ঘুরিয়ে দেখান তিনি। শহরের স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে উসমানীয় ও ইতালীয় শাসনামলের প্রভাবও তুলে ধরেন। পর্যটকেরা সোমালিয়ার উটের মাংস, সামুচা ও ঐতিহ্যবাহী চা-সহ স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পান। সুদি জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক খবর শুনে অনেক পর্যটক সোমালিয়ায় আসেন। কিন্তু বাস্তবে দেশটির সৌন্দর্য ও মানুষের আতিথেয়তা দেখে তারা বিস্মিত হন। বিশেষ করে মাছের বাজারে সামুদ্রিক মাছের বৈচিত্র্য তাদের মুগ্ধ করে। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, পর্যটক গাইডের কাজটি সুদির পারিবারিক পেশা। তার বাবা তিন দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সোমালিয়া ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। প্রায় তিন বছর আগে বাবার হাত ধরেই এ পেশায় যুক্ত হন সুদি। শখের বশে শুরু করলেও এখন কাজটিকে ভালোবাসেন তিনি। বাবার পাশাপাশি অন্য গাইডদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশ করছেন। টিকটকে এসব ভিডিওর মাধ্যমে সোমালিয়ার সৌন্দর্য বিশে^র মানুষের সামনে তুলে ধরছেন তিনি। ইংরেজিতেও কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার। প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর মোগাদিশু কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও বাস্তুচ্যুতির স্বীকার হয়েছে। ২০১১ সালে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাব শহরের অধিকাংশ এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পর এবং ২০১২ সালে ফেডারেল সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়। প্রবাসী সোমালীয়, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের হাত ধরে শহরে নতুন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসন গড়ে উঠেছে। তবে নিরাপত্তাঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। দেশটির পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সোমালিয়ায় প্রায় ১০ হাজার পর্যটক গিয়েছিলেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। মোগাদিশুতে পর্যটকেরা এখনও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন এবং বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাচৌকির মুখোমুখি হন। তবে সুদির দাবি, সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত পরিস্থিতির সঙ্গে বাস্তবে তাদের অভিজ্ঞতার অনেক পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ক্রিস রিসও দুবার মোগাদিশু ঘুরেছেন। প্রথমবার একা গিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা হওয়ায় দ্বিতীয়বার বন্ধুদের নিয়ে সেখানে যান। শহরের আবহাওয়া, খাবার, সৈকত ও মরুভূমির সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে। রোমানিয়ার পর্যটক মিহায়েলা পাতাপও সোমালিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের আন্তরিকতার প্রশংসা করেছেন। সুদির লক্ষ্য, সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত বিস্ফোরণ ও সংঘাতের পরিচিতির বাইরে পর্যটকদের কাছে অন্য এক সোমালিয়াকে তুলে ধরা। তার মতে, দেশটিতে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে প্রতিটি পর্যটকের আগমন মোগাদিশুর নতুন গল্প বিশ^বাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার আরেকটি সুযোগ।