অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মামলা যাচাইয়ে তালিকা দেওয়ার নির্দেশ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া মানবতাবিরোধী মামলাগুলো যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য জেলা পর্যায় থেকে মামলাগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের চতুর্থ ও শেষ দিনের তৃতীয় অধিবেশন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এ কথা জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ অধিবেশন হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মামলা হয়েছে, যেগুলো গণহত্যার মামলা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। আমরা তাদের (ডিসি) কাছে তালিকা চেয়েছি জেলা পর্যায়ে যে জেলাওয়ারি কতগুলো মামলা সে রকম দাখিল হয়েছে। এগুলো রিমোট ডিস্ট্রিক্টগুলোতে হয়তো কম, কিন্তু মহানগরগুলোতে সংখ্যা একটু বেশি। তাতে আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব যেন আপনারা সবাই জানেন অনেক মামলার মধ্যে হাজার হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব প্রকৃত অর্থে প্রকৃত আসামি কারা, সেটা তদন্ত কর্মকর্তারা তদন্ত করে দেখবেন এবং যেন স্বল্প সময়ের ভেতরে সেটা ডিসপোজ অব (নিষ্পত্তি) করতে পারে। তিনি বলেন, আর যাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাদের যেন নিষ্কৃতি দেয় সেই সুপারিশ আমরা করেছি। তবে এটা আইনানুগভাবেই হবে, আইনি প্রক্রিয়ায় হবে। ডিসিদের মামলাগুলো পাঠানোর জন্য কত দিন সময় দেওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বলেছি এটা দ্রুত পাঠাতে। মৌখিকভাবে বলেছি সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে পাঠাতে। কোনো ক্ষেত্রে কেউ যদি বিলম্ব করে থাকে, আমরা ন্যায় বিচারের স্বার্থে সেটা বিবেচনা করব। আশা করি যারা মামলা প্রত্যাহার চান, তারা তো বিলম্ব করবেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলা পর্যায়ে যে কমিটি আমরা করে দিয়েছিলাম হেডেড বাই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এডিএম, এসপি, পিপি এবং আরও একজন প্রতিনিধি আছে। তারা এই কমিটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে জনসাধারণের কাছে জানিয়েছে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এই সমস্ত ভুয়া মামলা, মিথ্যা মামলাগুলো যদি কারো বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তারা একটা ফরম আছে এই ফর্মের মধ্যে আবেদন করবে উইথ আইদার চার্জশিট, এফআইআর এবং এজাহারসহ। চার্জশিট হয়ে থাকলে চার্জশিটসহ কোন আদালতে মামলা ইত্যাদি তথ্য উল্লেখ করে। তারা সেটা যাচাই-বাছাই করে যদি সত্যিকারে সেই শ্রেণিভুক্ত মামলা হয়ে থাকে তখন সেগুলো প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ করবেন। মন্ত্রী বলেন, এগুলা প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসবে। আমরা এর ওপরে কোনো আইনি ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে নেব না। আমরা এটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। ওখানে আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কমিটি আছে, তারা ভেটিং করে যদি সঠিক পায় যে সমস্ত মামলা প্রত্যাহারের জন্য উপযুক্ত মনে করবেন তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠালে আমরা সিআরপিসির ৪৯৪ অনুসারে সেগুলো প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বা হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যেসব ভুয়া গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়েছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সময়ে, সেই মামলাগুলোর বিষয়ে আমরা আবার একটা পত্র দিয়েছিলাম দায়িত্ব গ্রহণের পরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কিছু কিছু মামলা, কিছু শ্রেণির মামলা অন্তর্ভুক্ত করা ছিল না তখন। যেমন হত্যা মামলা, অস্ত্র মামলা, নারী নির্যাতন, মাদকপাচার, মানবপাচার এই সমস্ত কিছু মামলা এই আওতাভুক্ত করা ছিল না তখন। তিনি বলেন, আমরা পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিবেচনা করেছি যে আমাদের বিরুদ্ধেও অনেক অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা ছিল, আমার জানামতে অন্তত দুই-তিনটা, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায়। চৌদ্দগ্রামের মামলাসহ আমার বিরুদ্ধেও একই মামলাগুলো ছিল। অস্ত্র মামলাও ছিল। আমাদের অনেক নেতার বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেওয়া হয়েছিল, নারী নির্যাতনসহ যে কোনোভাবে যেন আটক রাখা যায় সেই মামলাগুলো দেওয়া হয়েছিল।
সড়ক ও রেললাইনের পাশে পশুর হাট নয়: আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর সড়ক ও রেললাইনের পাশে কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে মহাসড়ক ও রেললাইনের আশপাশে পশুর হাট বসানো বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তে প্রয়োজনীয় মেশিন স্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বড় পশুর হাটগুলোতে পুলিশের বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হবে। কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকার ট্যানারিগুলোর সীমিত ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রেখে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য চামড়া অন্তত সাত দিন লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে এবং সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, মাদক, চাঁদাবাজি ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত রয়েছে। অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ও ওয়েবসাইট বন্ধে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কিছু সাইট ব্লক করার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ঘিরে কোনো আশঙ্কা নেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর হত্যা মামলায় সাংবাদিকদের আসামি করার বিষয়টি সরকার যাচাই-বাছাই করছে। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আওয়ামী আমলে দেওয়া অস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই-বাছাই হবে: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে দেওয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়ে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারির পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক ও দলীয় বিবেচনায় অনেক অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। সেগুলো ফেরত না দিয়ে যাচাই-বাছাইয়ে জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উপলক্ষে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র জমা নেওয়া হয়েছিল। সেগুলো এখনও ফেরত দেয়া হয়নি। সেগুলো দ্রুত ফেরত দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে সরকারের নির্দেশনার পরও ১০ হাজার লাইসেন্সকৃত অস্ত্র জমা পড়েনি। সেগুলো উদ্ধারেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এসব লাইসেন্সধারীর বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য বলা হয়েছে। অনলাইন জুয়া এবং মাদকবিরোধী অভিযান যথারীতি পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সালাহ উদ্দিন আহমদ। কোরবানির হাট নিয়ে তিনি বলেন, সড়ক-মহাসড়কের দুই ধারে পশুর হাট বসবে না। এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি। ঈদের সময় ফেরিতে গাড়ি উঠানামার সময় যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।