বিমানবাহিনীর চাকরিচ্যুত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নিহত তাহসিফ সৌরির বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, আমার ছেলে দেশের একজন সুনাগরিক ছিল। সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্য ছিল। তার এ ধরনের মৃত্যুর যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান। তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় এখনও থানায় মামলা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মামলার এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি মামলার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারের নিজস্ব আইনে ছেলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, আমরা পারিবারিকভাবে এখনও কোনও ধরনের মামলার সিদ্ধান্ত নিইনি। মামলা করবো কিনা, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ আমাদের নানা ব্যস্ততা আছে। হয়তো আজ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। তবে আমরা চাই থানায় গিয়ে দুই কলম কী লিখলাম বা না লিখলাম, সেটির ওপর সরকার গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক। উত্তরখান থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নিহত তাহসিফের বাবাকে ফোন দিয়ে থানায় মামলা করার জন্য বলা হলেও এখনও তিনি থানায় আসেননি। তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন দীপ। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে নৌ পুলিশের পাশাপাশি এ ঘটনার ছায়াতদন্ত করছে পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থাটি। তবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি পিবিআই। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার দিনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পিবিআইয়ের কাছে তুলে ধরেন দীপ। গতকাল শুক্রবার পিবিআই শাহরিয়ার দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসভবন থেকে তাকে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। দীপকে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর তথ্য দিয়ে পিবিআইর পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, দীপ বলেছেন, আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ ভাই নদীতে ঝাঁপ দেয়। আর আমি পালিয়ে আসি। তবে দীপের এ কথাসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল বলেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। এর আগে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, তাহসিফ ও তিনি একসঙ্গে গ্যারেজে যান। রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে আলাদা হয়ে যান। উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হয়ে যান তারা। এরপর বাসায় ফিরে তাহসিফকে ফোন দিলে তার মোবাইল বন্ধ পান বলে জানান দীপ। কেন এমনটি বলেছিলেন দীপ সেই প্রশ্নের উত্তর বের করার চেষ্টা করছেন পিবিআই কর্মকর্তারা। তবে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধারের পেছনে দীপের কোনও ভূমিকা রয়েছে কিনা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। পিবিআই জানিয়েছে, দীপের দেওয়া বক্তব্য ও তথ্যগুলো সরেজমিন যাচাই-বাছাই ও প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। গত ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নদী পুলিশ। মরদেহের কাছে থাকা আইফোন ও হাতঘড়ি দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের সন্দেহ, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি জানান, ২৭ অক্টোবর সারা দিন পরিবারের জন্য কেনাকাটা করে সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মাকে ‘আম্মু আমি আসছি’ লিখে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠান। এরপর থেকেই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের মাধ্যমে লাশ উদ্ধারের খবর পায় পরিবার। তাহসিফের বাবা জানান, তার ছেলে এর আগে কখনও রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যাননি। এদিকে দীপের বাবর রোডের বাসায় গিয়ে পাওয়া যায়নি পরিবারের কাউকে। বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, দীপ একজন শিক্ষার্থী। তাহসিফের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না তারা। তবে ঘটনার দিন রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন দীপ।
আমার ছেলে দেশের একজন সুনাগরিক ছিল: তাহসিফ সৌরির বাবা
