পদত্যাগ করলেন নেপালের ‘আলোচিত’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং

নিজের আর্থিক লেনদেন নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে গতকাল বুধবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং। দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার নিয়ে গত মাসে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহর মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির। গত সেপ্টেম্বরে নেপালের পূর্ববর্তী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা জেনারেশন জেড (জেন-জি) আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এই নেতা জানান, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ‘সুষ্ঠু তদন্ত’ নিশ্চিত করতেই তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। ৩৮ বছর বয়সী গুরুং তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লিখেন, ‘আমি আজ থেকে কার্যকর হওয়ার শর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে পদের চেয়ে নৈতিকতা বড় এবং জনআস্থার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ-এর প্রেস উপদেষ্টা দীপা দাহাল নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুং গত বছর নেপালের সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন যা শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাময়িক নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও পরে দুর্নীতি এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনবিক্ষোভে রূপ নেয়। গত বছরের ৭-৮ সেপ্টেম্বরের সেই দুই দিনের সহিংসতায় অন্তত ৭৬ জন নিহত এবং আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। এ বছরের জানুয়ারি মাসে গুরুং রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-তে যোগ দেন এবং মার্চ মাসের নির্বাচনে দলটির ভূমিধস জয়ের পর তিনি পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে সেপ্টেম্বরের সেই দমন-পীড়নে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে গুরুং সংবাদ শিরোনামে এসেছিলেন। তবে শিগগিরই তিনি নিজেই তাঁর আর্থিক বিনিয়োগ, সম্পদ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্তাধীন এক বিতর্কিত ব্যবসায়ীর সাথে যোগসাজশের অভিযোগে জর্জরিত হন। গত সোমবার গুরুং এসব অভিযোগকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু এটাই বলতে চাই যে অভিযোগ এবং সত্য এক জিনিস নয়। সিদ্ধান্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত, আবেগের ওপর নয়।’ আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শ্রমমন্ত্রী বরখাস্ত হওয়ার পর নতুন এই সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করলেন সুদান গুরুং। সুদান গুরুং মূলত তৃণমূলের নেতা। একসময় পার্টি আর নাইটলাইফ ইভেন্ট আয়োজনের জন্য পরিচিত গুরুংয়ের যুবনেতা হয়ে ওঠাটা ছিল অপ্রত্যাশিত, কিন্তু সচেতন সিদ্ধান্ত। তিনি ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর যুবক-নেতৃত্বাধীন এনজিও ‘হামি নেপাল’ প্রতিষ্ঠান করেন। ওই ভূমিকম্পে তার সন্তানের মৃত্যু হয়। যে ঘটনা তার জীবনের পথ বদলে দেয়। ২০২০ সালে সুদান গুরুং ‘হামি নেপাল’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি একটি বেসরকারি সংস্থা যা কোভিড-১৯ মহামারীর সময় একটি সম্প্রদায়-ভিত্তিক জরুরি সাড়া প্রদানকারী উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২০ সালে সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয় এবং একটি যুব-নেতৃত্বাধীন, অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে, যা সরাসরি ত্রাণ সহায়তা এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
সংস্থাটি বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছে, যার মধ্যে ২০২১ সালে নেপালের বন্যায় সহায়তা এবং ২০২৩ সালে তুরস্ক-সিরিয়া ভূমিকম্পের মতো আন্তর্জাতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণ প্রদান উল্লেখযোগ্য। কোভিড-১৯ এবং সামাজিক ত্রাণ কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য সংস্থাটি বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতিও অর্জন করেছে।

সুদান গুরুংয়ের রাজনৈতিক জীবন
বৃহত্তর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাঁর নেতৃত্বের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে। সে সময় তিনি বি. পি. কৈরালা ইনস্টিটিউট অফ হেলথ সায়েন্সেসে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রধান হিসেবে আবির্ভূত হন, যেখানে তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে আরও স্বচ্ছতার দাবি জানান।
২০২৫ সালের নেপালি জেনারেশন জেড (জেন জি) আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তীকালে তিনি এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। তিনি অশোক রাজ সিগদেল-এর সাথে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, যার ফলে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি-কে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয় এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়। সুদান গুরুং ২০২৬ সালে নেপালের সাধারণ নির্বাচনে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং একে একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যদি জেনারেশন জেড বা তরুণ প্রজন্মের চাহিদা পূরণ না হয়, তবে নির্বাচনে বাধা দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-তে যোগ দেন এবং গোর্খা-১ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি ২৯ হাজার ৮৯৬ ভোট পেয়ে ওই আসনে জয়লাভ করেন। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ-এর নেতৃত্বাধীন সরকার সুদান গুরুংকে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করে। এরপর গতকাল বুধবার ক্রমবর্ধমান বিতর্ক এবং জনরোষের মুখে নৈতিক দায় স্বীকার করে তিনি পদত্যাগ করেন।