বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদে দুঃখ প্রকাশ জ¦ালানি প্রতিমন্ত্রীর

দেশজুড়ে চলমান তীব্র লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জাতীয় সংসদে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একইসঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের ভুল ও অপরিকল্পিত নীতিকে দায়ী করেছেন তিনি। গতকাল বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। তার দাবি, এ বছরের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি নয়, গোটা ৫৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণে সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কী এবং ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভবÑপ্রতিমন্ত্রীর কাছে তা জানতে চান তিনি। জবাবে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আমরা নিছক কথামালার আড়ালে প্রকৃত সত্যকে লুকাতে চাই না। বলতে কোনও দ্বিধা নেই, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সরবরাহের কারণে কষ্টে আছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য শুধু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বাংলাদেশের জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বর্তমান সংকটকে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এই সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে গ্যাস সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে। কয়লা ব্যবহারে জ্বালানি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা: বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বুলবুলের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে শুধু একটি নির্দিষ্ট জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য কয়লা, গ্যাস, এলএনজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফুলবাড়ীসহ কয়লা উত্তোলনের যেকোনও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরিবেশগত উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা এসব বিষয় পর্যালোচনা করব এবং পরিবেশগত বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে যেকোনোও সিদ্ধান্ত নেব। এদিকে, সংসদ সদস্য সাবিকুন নাহারের সংশ্লিষ্ট এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ফুলবাড়ীর উচ্চমানের কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ ধরনের কোনও প্রকল্প নেওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফুলবাড়ীর কয়লা বিশ্বের অন্যতম সেরা মানের কয়লা। আমরা যদি এই কয়লা উত্তোলন করে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে পারি, তাহলে তা অবশ্যই দেশের জন্য ভালো হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানানো হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বার্থ ও জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতিবিদ এবং আমরা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে এলাকার কৃষিজমি ও বসতিতে প্রভাব পড়তে পারেÑএ কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কীভাবে যথাযথভাবে পুনর্বাসন করা যায়, তা আগে পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে তাদের আয় ও জীবিকা যাতে ব্যাহত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মানুষ কীভাবে এর সুফল পেতে পারেন, সেই বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সাবিকুন নাহার বলেন, কয়লা উত্তোলন বাড়ালে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়তা হতে পারে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ফলে কৃষিজমি, বসতি, ভূগর্ভস্থ পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে বছরের পর বছর ধরে উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে কৃষিজমি ধ্বংস, হাজারো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া যায় না। প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার আগে ব্যাপক পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা পরিচালনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।