দেশজুড়ে বেকার তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে বড় পরিসরের একটি কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে সরকার। প্রায় ২৭৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশিক্ষণ বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় লাখো যুবক-যুবতীকে বিভিন্ন পেশাভিত্তিক দক্ষতায় গড়ে তোলা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ৫০৫টি উপজেলায় ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এতে প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী অংশ নেবে, যাদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের একটি বড় অংশকে আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে যুব উন্নয়ন অধিদফতর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটি সফল হলে দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্তত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখের কাছাকাছি। সেই তুলনায় এই প্রকল্পকে একটি বড় পরিসরের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না-এমন সতর্কতাও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা, অর্থায়ন সুবিধা এবং পরবর্তী সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এই ধরনের উদ্যোগের প্রভাব সীমিত হয়ে যেতে পারে।
প্রকল্পে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা রাখা হয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পাস, যাতে প্রান্তিক ও কম শিক্ষিত তরুণরাও সহজে যুক্ত হতে পারে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে রাখা হয়েছে স্বল্পমেয়াদি-১৪ দিন ও ২১ দিনের কোর্সে বিভক্ত-যাতে দ্রুত দক্ষতা অর্জন করে কাজে যুক্ত হওয়া সম্ভব হয়।
প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু নির্ধারণেও রাখা হয়েছে বৈচিত্র্য। স্থানীয় বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রান্না ও স্ট্রিট ফুড প্রস্তুত, মাছ চাষ, পোল্ট্রি ও দুগ্ধ খামার, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, হস্তশিল্প, পোশাক তৈরি, ব্লক-বাটিক প্রিন্টিং, পর্যটন গাইডিং, মোবাইল ও যানবাহন মেরামতসহ বিভিন্ন ট্রেড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল খাতেও গুরুত্ব দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ রাখা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাজের সুযোগ তৈরি হয়।
এই প্রকল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পরিবারভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একটি পরিবারের একাধিক সদস্যকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, সবজি ও ফল চাষের মতো কার্যক্রম এতে অন্তর্ভুক্ত থাকছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহুমুখী আয়ের উৎস তৈরি করবে।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই কর্মসূচিতে। বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রশিক্ষণ ব্যাচের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে-সমতল এলাকায় প্রতি ব্যাচে ২৫ জন এবং হাওর, উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলে ২০ জন করে।
প্রশিক্ষণ চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে, যা তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে নিম্নআয়ের তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এটি আগের একটি সফল কর্মসূচির সম্প্রসারিত রূপ। পূর্ববর্তী ধাপে সীমিত পরিসরে বাস্তবায়িত এই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তার ওপর। যদি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, বাজারসংযোগ ও পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বিপুল যুবশক্তি এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এই জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে পারলে অর্থনীতিতে গতি আসবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প, প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো ছাড়া এই ধরনের উদ্যোগের প্রভাব সীমিত হয়ে যেতে পারে বলেও তারা সতর্ক করছেন।
