অবসর ভাতার জন্য শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না: প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি সরকার যতদিন সরকারে আছে ততদিন শিক্ষকদের আর অবসর ভাতার জন্য অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এদিন প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ চার বছর ধরে আটকে থাকা ৭০ হাজার ১১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকার বকেয়া ভাতার জট খুলেন। সরকারের এককালীন ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে রইঅঝ+ সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষকদের নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো শুরু হয়। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, যতদিন আপনাদের নির্বাচিত বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে আপনাদেরকে আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। আগামী দিনগুলোতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর যন্ত্রণা ছাড়াই যথাসময়ে অনলাইনে আপনাদের প্রাপ্য টাকা অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। শিক্ষকদের হয়রানির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, শিক্ষক সমাজ যারা নীতি-নৈতিকতা আর আদর্শের বাণী শিখিয়ে লাখো শিক্ষার্থীকে বড় করে তোলেন, তাদেরকেই যদি নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয় কিংবা অফিসে অফিসে ঘুরে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তবে সেটি শুধু শিক্ষকদের হয়রানি নয়; বরং জাতি হিসেবে আমাদের দীনতা ও হীনতাই প্রকাশ পায়। আজ আমরা কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে তাদের টাকা পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। তারেক রহমান বলেন, টাকা পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা অত সহজ ছিল না। পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী সরকার যেভাবে ব্যাংক-বিমাসহ প্রতিটি সেক্টর থেকে লুটপাট করেছিল, শিক্ষকদের এই তহবিল দুটিও তা থেকে রেহাই পায়নি। জাল ইনডেক্স তৈরি করে এবং দুর্বল ব্যাংকে অর্থ সরিয়ে এই তহবিল দুটিকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল। ফলে ২০২২ সাল থেকে শিক্ষকরা চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েন। বর্তমান সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় শিক্ষকদের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে এই বিশাল অর্থের সংকুলান করেছে। বক্তব্যের শুরুতে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী দেন, শিক্ষকদের কল্যাণে বেগম জিয়ার উদ্যোগেই ১৯৯১ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং ২০০২ সালে অবসর সুবিধা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা বিস্তারে, বিশেষ করে নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার ভূমিকা আজ বিশ্বজুড়ে রোল মডেল। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সমাজের ‘আলোকবর্তিকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা প্রচলিত নিয়মে পেশা থেকে অবসর নিলেও শিক্ষক হিসেবে আপনাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের আবহমান কালের ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপনারা ভূমিকা রাখবেন। সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিনের বকেয়া অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পরিশোধে সরকার এককালীন ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। দেশের ৬৪ জেলায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এবার অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার ১১৯ জন এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৫৩ হাজার ৪৭৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী অর্থ পাবেন। সব মিলিয়ে প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এ কর্মসূচির আওতায় আসছেন। এর আগে প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ১৯ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়ায় পরে তা ১ লাখ ২৩ হাজার করা হয়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিচ্ছে। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে চরম কষ্টে ছিলেন। তাদের দুর্ভোগ লাঘব করতেই সরকার এ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো ‘আইবাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হবে। ফলে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।