বাবা কবে সুস্থ হবে? ক্যানসারে আক্রান্ত বাবার পাশে ছোট্ট মেয়ের নীরব অপেক্ষা

ইসলামপুর সংবাদদাতা
বাবার বিছানার পাশে চুপচাপ বসে থাকে ছোট্ট মেয়েটি। কখনো বাবার মুখের দিকে তাকায়, আবার কখনো হাত ধরে থাকে। ক্যানসার কী, চিকিৎসায় কত টাকা লাগে এসবের কিছুই বোঝে না সে। শুধু জানে, তার বাবা অসুস্থ। আর তার একটাই চাওয়া বাবা সুস্থ হয়ে আবার তাকে কোলে নেবেন।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চরগোয়ালিনী ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের শাইবালীর পরিবারের এখন এমনই দিন কাটছে। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী শাইবালী। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় পরিবারের সঞ্চয় ও শেষ সম্বলটুকুও শেষ হয়ে গেছে। অর্থের অভাবে এখন নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একসময় শাইবালীর পরিবারে অভাব ছিল না। জমিজমা ছিল, ছিল নিজের একটি ঘরও। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে একে একে তাঁদের জমিজমা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তবুও থেমে থাকেননি শাইবালী। দিন-রাত পরিশ্রম করে সংসার চালিয়েছেন। প্রায় ৩০ বছর আগে পারিবারিকভাবে পিয়ারা বেগমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের চার মেয়ে। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়েটি এখন বাবা-মায়ের সঙ্গেই রয়েছে।
কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে সংসারের আয়। স্বামীর চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পিয়ারা বেগমকে এখন সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পিয়ারা বেগম বলেন, স্বামীকে সুস্থ করতে চাই। কিন্তু চিকিৎসার খরচ চালানোর মতো টাকা আমাদের নেই। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে। কী করব, বুঝতে পারছি না।
ক্যানসার ধরা পড়ার পর চিকিৎসা শুরু করেছিলেন শাইবালী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ। নদীভাঙনে জমিজমা হারানোর পর যে সামান্য সম্বল অবশিষ্ট ছিল, সেটিও চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করতে হয়েছে। এখন ওষুধ কেনার টাকাও অনেক সময় জোগাড় করতে পারছেন না তাঁরা।
শাইবালী বলেন, সারা জীবন কাজ করেছি। মেয়েদের বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। এখন নিজেই অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছি। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো টাকা নেই। পরিবারের মানুষগুলোর কষ্ট দেখতে হয় এটাই সবচেয়ে বেশি কষ্টের।
শুধু চিকিৎসার সংকটই নয়, তাঁদের বসতঘরটিও জরাজীর্ণ। বাবা-দাদার রেখে যাওয়া পুরোনো ঘরটিই এখন তাঁদের শেষ আশ্রয়। ঘরের টিনের অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। কখনো জীর্ণ টিনের অংশ খসে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। অসুস্থ শাইবালীকে নিয়েই সেই ঘরে দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অর্থের অভাবে শাইবালীর চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা করানোর খরচ জোগাড় করাই তাঁদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন তাঁরা।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের দৃশ্যটি দেখা যায় শাইবালীর ছোট মেয়েটিকে ঘিরে। বাবার অসুস্থতার গভীরতা বোঝে না সে। আগে বাবা তাকে কোলে নিতেন, আদর করতেন। এখন বাবা বিছানায় পড়ে থাকেন। তাই প্রতিদিন বাবার পাশে বসে তার অপেক্ষা কবে বাবা সুস্থ হবেন, কবে আবার তাকে কোলে নেবেন।
ছোট্ট মেয়েটি বলে, আমার বাবা ভালো হয়ে উঠুক, আবার যেন আমাকে কোলে নেয়।
শিশুটির এই সরল আকুতির মধ্যেই যেন পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে। একদিকে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জমিজমা হারানোর দীর্ঘ ক্ষত, অন্যদিকে ক্যানসারের নির্মম আঘাত দুই সংকটে বিপর্যস্ত শাইবালীর পরিবার।
এখন তাঁদের একমাত্র চাওয়া, অর্থের অভাবে যেন শাইবালীর চিকিৎসা বন্ধ না হয়। তিনি সুস্থ হয়ে আবার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন এই আশাতেই দিন গুনছে স্ত্রী পিয়ারা ও ছোট মেয়েটি।
মেয়েটি ক্যানসার বোঝে না, বোঝে না অর্থের অভাবও। সে শুধু বোঝে বাবা অসুস্থ। আর তার একটাই চাওয়া, বাবা যেন আবার ভালো হয়ে তাকে কোলে নেন।
ক্যান্সারে আক্রান্ত শাইবালীর মেয়ে সাহিদা আক্তার জানান, আমার বাবা গুরুতর অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসার জন্য আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি। কেউ সাহায্য করতে চাইলে নিচের নম্বরে বিকাশ করতে পারেন। বিকাশ ও যোগাযোগ: ০১৮১১৫৪৮৪৭৮। এ বিষয়ে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা হাফেজ উদ্দিন জানান, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের জন্য সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যোগাযোগ করলে বিধি অনুযায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।