বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস: অনন্য এবং ঐক্যবদ্ধ ॥ মৌমিকা জামান॥

একটি শিশুর প্রথমবার বসে ওঠা, দাঁড়ানো কিংবা কয়েক পা এগিয়ে যাওয়া-অভিভাবকের কাছে প্রতিটি অর্জনই আনন্দের। কিন্তু কোনো শিশু যদি বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত বিকাশগত ধাপ অর্জনে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, বিকাশে এমন কিছু পার্থক্য সেরিব্রাল পালসির মতো নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে।

আজ ৬ই অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। দিবসটির লক্ষ্য শুধু সেরিব্রাল পালসি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা নয়; বরং এই অবস্থার সঙ্গে বসবাসকারী মানুষদের সক্ষমতা, অধিকার, ব্যক্তিসত্তা ও সম্ভাবনাকে সামনে তুলে ধরা। স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক জীবন এবং জনপরিসরে তাদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও এই সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ বছরের প্রতিপাদ্য “অনন্য এবং ঐক্যবদ্ধ” (টহরয়ঁব ধহফ টহরঃবফ)। প্রতিটি মানুষ তার সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনের দিক থেকে আলাদা। এই বৈচিত্র্যকে সম্মান করে সম্মিলিতভাবে কাজ করাই পারে আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে।

সেরিব্রাল পালসি কী?
সেরিব্রাল পালসি বা ঈবৎবনৎধষ চধষংু (ঈচ) হলো বিকাশমান মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বিকাশ বা ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত একদল স্নায়বিক অবস্থা। এর প্রধান প্রভাব পড়ে নড়াচড়া, পেশির নিয়ন্ত্রণ, অঙ্গবিন্যাস ও ভারসাম্যের ওপর। তবে সিপির প্রভাব শুধু চলাফেরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তি বিশেষে যোগাযোগ, দৃষ্টি, শ্রবণ, খাবার চিবানো বা গিলতে পারা, শেখা কিংবা অন্যান্য দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা থাকতে পারে। সিপির প্রকাশও সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কারও পেশিতে অতিরিক্ত শক্তভাব বা টান থাকতে পারে, কারও অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া কিংবা ভারসাম্যের সমস্যা থাকতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে একাধিক বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। এ কারণেই প্রতিটি শিশুর মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা তার ব্যক্তিগত প্রযোজন অনুযায়ী হওয়া জরুরি।

বিশ্বজুড়ে কত মানুষ সিপিতে আক্রান্ত?
সেরিব্রাল পালসি বিশ্বের অন্যতম সাধারণ শৈশবকালীন মোটর প্রতিবন্ধকতা। বিভিন্ন গবেষণায় এর প্রকোপ প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মে প্রায় ২-৩ জনের কাছাকাছি পাওয়া গেলেও অঞ্চল, গবেষণার পদ্ধতি ও জনগোষ্ঠীভেদে এই হার পরিবর্তিত হতে পারে। বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবসের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বসবাস করছেন এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছেন প্রায় ৩৫ কোটি পরিবার-সদস্য, অভিভাবক ও কেয়ারগিভার।

কেন হয় সেরিব্রাল পালসি?
সেরিব্রাল পালসির একক কোনো কারণ নেই। গর্ভাবস্থায় কিছু সংক্রমণ বা জটিলতা, ভ্রূণের মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বিকাশ, অপরিণত অবস্থায় জন্ম, কম জন্ম ওজন এবং জন্মের আগে বা আশপাশের সময়ে মস্তিষ্কে ক্ষতি-এসবের সঙ্গে সিপির ঝুঁকি সম্পর্কিত হতে পারে।
একসময় ধারণা করা হতো, জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতিই সেরিব্রাল পালসির প্রধান কারণ। বর্তমানে জানা যায়, এটি কেবল কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে; অনেক শিশুর ক্ষেত্রে জন্মের আগেই মস্তিষ্কের বিকাশজনিত পরিবর্তন বা অন্যান্য কারণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না। জন্মের পর মস্তিষ্কের সংক্রমণ, গুরুতর মাথায় আঘাত এবং নবজাতকের মারাত্মক জন্ডিস থেকে কার্নিক্টেরাসের মতো জটিলতাও কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে সিপির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শিশুর কোন লক্ষণগুলোতে সতর্ক হবেন?
শিশুর বিকাশে কিছুটা তারতম্য স্বাভাবিক হলেও নির্দিষ্ট বয়সে প্রত্যাশিত মাইলস্টোন অর্জনে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন-মাথা ও ঘাড় নিয়ন্ত্রণে দেরি, বসতে বা গড়াগড়ি দিতে দেরি, হামাগুড়ি বা হাঁটতে সমস্যা, শরীরের এক পাশ বেশি ব্যবহার করা, পেশির টোন অস্বাভাবিকভাবে বেশি বা কম থাকা এবং ভারসাম্য ও সমন্বয়ের সমস্যা। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে কথা বলা, যোগাযোগ, খাবার চিবানো বা গিলতে পারা, অতিরিক্ত লালা পড়া, দৃষ্টি বা শ্রবণ এবং খিঁচুনির মতো সমস্যাও থাকতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই সেরিব্রাল পালসি নিশ্চিত-এমন নয়। সঠিক মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

পুনর্বাসনেই বাড়ে সক্ষমতার সুযোগ
সেরিব্রাল পালসির কোনো একক নিরাময়মূলক চিকিৎসা নেই। তবে শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত শনাক্তকরণ ও লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্বাসন তার কার্যক্ষমতা, স্বাধীনতা এবং জীবনমান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। সিপির ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু নিউরোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ, অর্থোটিস্ট, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী, দন্ত চিকিৎসক ও সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হতে পারে।

ফিজিওথেরাপি: চলার পাশাপাশি জীবনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি
সেরিব্রাল পালসি পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, সমস্যা ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য বিবেচনা করে থেরাপির পরিকল্পনা করা হয়। পেশির টোন ও শক্তি নিয়ন্ত্রণ, অঙ্গবিন্যাস, ভারসাম্য, সমন্বয়, স্থানান্তর, দাঁড়ানো ও হাঁটার দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন থেরাপিউটিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী গেইট ট্রেনিং, অবস্থানগত ব্যবস্থাপনা, সহায়ক যন্ত্রের ব্যবহার এবং বাড়িতে শিশুর যত্ন ও অনুশীলন সম্পর্কে পরিবারকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। তবে ফিজিওথেরাপির লক্ষ্য শুধু হাঁটা শেখানো নয়; বরং শিশুকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যতটা সম্ভব স্বাধীন করে তোলা এবং পরিবার ও সমাজে তার অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

পরিচয় হোক সম্ভাবনায়
সেরিব্রাল পালসি থাকা একজন মানুষকে কেবল তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। তারও রয়েছে নিজস্ব ইচ্ছা, প্রতিভা, অনুভূতি, শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাই প্রয়োজন করুণার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে তাদের দেখা। সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পরিবারকে সহায়তা এবং সবার জন্য প্রবেশযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বসবাসকারী মানুষ আরও স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারবেন।

লেখক: মৌমিকা জামান
ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট
সিআরপি চট্টগ্রাম, এ. কে. খান কেন্দ্র।