ব্র্যাকের উদ্যোগে অনাবাদী জমিতে দুর্গম টিনেরচরে এখন ভুট্টার বাম্পার ফলন

খাদেমুল ইসলাম
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে উপজেলার চুকাইবাড়ী ইউনিয়নের যমুনার পশ্চিম পাড়ে দুর্গম টিনেরচরের অনেক জমি বছরের অধিকাংশ সময় পতিত হয়ে পড়ে থাকত। দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতেন কৃষকেরা। অনেকেই মনে করতেন, এসব জমিতে লাভজনকভাবে ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ব্র্যাক এর জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির আওতাধীন ব্র্যাক এডাপটেশন ক্লিনিক এখন এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করেছে। টেকসই ও অভিযোজন সক্ষম কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি মাঠ পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের জলবায়ু সহনশীল ফসল চাষ, উন্নত ও স্বল্পমেয়াদি জাতের বীজ ব্যবহার, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির নানা কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে ডেমোনস্ট্রেশন প্লট স্থাপনের মাধ্যমে কৃষকদের হাতে-কলমে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি শেখানো হচ্ছে। ফলে কৃষকেরা পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হচ্ছেন।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার টিনেরচর গ্রামে এই উদ্যোগের দৃশ্যমান সফলতা পাওয়া গেছে। চলতি মৌসুমে পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ৭৫০ বিঘা জমিতে আগাম উচ্চফলনশীল ভুট্টার চাষ করা হয়েছে। ব্র্যাকের সহায়তায় কৃষকেরা স্বল্প মেয়াদি উন্নত জাতের ভুট্টার বীজ ব্যবহার করছেন, যাতে বন্যার আগেই দ্রুত ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় কমছে এবং ফলনও বাড়ছে।
শুধু ফসল উৎপাদনেই নয়, কৃষকদের আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগও তৈরি করা হচ্ছে। বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় দ্রুত ভুট্টা সংগ্রহ নিশ্চিত করতে কৃষকদের মাঝে ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তারা নিজেদের জমির ভুট্টা মাড়াই করার পাশাপাশি এলাকার অন্যান্য কৃষকদের সেবা দিয়ে অতিরিক্ত আয় করছেন। এতে গ্রামীণ পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান ও বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
একই সঙ্গে এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি এবং দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে রূপান্তরের মাধ্যমে শস্য বিন্যাস উন্নয়ন করা হচ্ছে। এতে ফসলের নিবিড়তা বাড়ছে এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। আন্তঃফসল চাষ, জৈব সার ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার ফলে কৃষকদের মধ্যে টেকসই কৃষি পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ফসলের বৈচিত্র্য আনয়নের লক্ষ্যে রঙিন ফুলকপি, ব্রকলি, স্কোয়াশ, গাজরসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের সবজি চাষেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবারের পুষ্টি চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। বিশেষ করে নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করেছে। অনেক নারী এখন বসতবাড়িতে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন। পরিবারের চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে তারা বাড়তি আয় করছেন। এই আয় থেকে সঞ্চয় গড়ে তুলে দুর্যোগকালীন সময়ে পরিবারকে সহায়তা করতেও সক্ষম হচ্ছেন তারা।
এছাড়াও ব্র্যাক এডাপটেশন ক্লিনিক ও ভ্রাম্যমাণ এডাপটেশন ক্লিনিকের মাধ্যমে কৃষকেরা নিয়মিত রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত পরামর্শ গ্রহণ করে তাৎক্ষণিক সমাধান পাচ্ছেন কৃষকেরা। পাশাপাশি আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে সময়োপযোগী কৃষি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, যা ঝুঁকি কমানো ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, ব্র্যাক এডাপটেশন ক্লিনিক শুধু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যে জমিকে একসময় অনাবাদি ও অনুপযোগী মনে করা হতো, আজ সেই জমিতেই সফলভাবে ফসল উৎপাদন হচ্ছে। এতে কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে এবং দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।