অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। গতকাল রোববার দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে এ বৈঠক শুরু হয়েছে, যেখানে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক কোনো দলই অংশ নিচ্ছে না। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের কোনো প্রতিনিধিও বৈঠকে অংশ নেয়নি। বেলা আড়াইটায় যখন মতবিনিময় শুরু হয়, সে সময় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “আমরা যারা রাজপথের বিরোধী দল আছি, তাদের অনেকে আছে। তবে সংসদের বিরোধী দলকে দেখতে পাচ্ছি না।” সংবিধান সংশোধন কমিটির মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য। রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের নেতা, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মতবিনিময়ের জন্য প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। “১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তারা সংবিধান সংশোধনের কোনো উদ্যোগকে ধারণাগতভাবে সমর্থন করবেন না।” সংবাদ সম্মেলনের পাশাপাশি জোটের শরিক দলগুলো বিবৃতি দিয়েও কমিটির মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে জানিয়েছে। দুপুরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক হাসান জুনাইদের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলটির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। “গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ জনগণের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সংবিধান সংশোধনের পক্ষে নয় বরং গণভোটের রায়ের আলোকে জনগণের মতামত ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।” দলটি বলেছে, গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে কিংবা তার বাইরে গিয়ে কোনো প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এনসপির মিডিয়া কমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত বলেন, “এনসিপির পক্ষ থেকে মতবিনিময়ে কেউ অংশগ্রহণ করছে না।”
জামায়াত-জোটের আরেক শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) দলের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, তার দল মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং দলের এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। আমন্ত্রণ পেলেও মত দিতে না যাওয়ার কথা বলেছে ইসলামী আন্দোলন। দলের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, “সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত জুলাই গণভোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সরকারের ‘মনের মতো’ সংবিধান সংশোধন করার খেলায় অংশ নিতে চায় না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাই আজকের বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যোগ দেবে না।” তিনি বলেন, “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে জুলাই সনদ ও গণভোটের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংবিধান সংস্কার হতে হবে।” বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডিও বলেছে তারা মতবিনিময় সভায় যাচ্ছে না। জুলাই সনদ সংলাপে অংশ নিলেও তাতে স্বাক্ষর করেনি তিনটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ। সংবিধান সংশোধন কমিটির গতকাল রোববারের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হয়নি। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।” গেল ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও বিশেষ কমিটিতে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো নাম প্রস্তাব করেনি। সংসদে তারা বলেছেন, কমিটির ধারণাগত ভিত্তিই তারা গ্রহণ করেন না; তাই এতে সদস্য দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না। তবে বিএনপি বলছে, যেকোনো সময় জামায়াত নাম প্রস্তাব করলে তাদের যুক্ত করা হবে। গেল ৪ অগাস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক করে। ওই বৈঠকের পর কমিটি জানিয়েছিল, জুলাই আন্দোলনের সকল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধানের সংশোধন চূড়ান্ত করা হবে। ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া তৈরির জন্য ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান বা চেয়ারম্যান ছিলেন ড. কামাল হোসেন। এর পর বিভিন্ন সরকারের সময় সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে চাকরিতে কোটা নিয়ে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্রসংস্কারের জোরালো দাবি ওঠে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের হাল ধরার পর সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারসহ ১১টি খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক পেরিয়ে গত বছরের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নেন। অন্যদিকে আলাদা করে উভয় শপথই নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য।
রাজনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে সংবিধান সংশোধন কমিটি, নেই বিরোধী জোটের কেউ
