রান্নায় গরুর সবুজ মাংস হল কেন, ল্যাব পরীক্ষার ফল জানতে লাগবে এক সপ্তাহ

খুলনার পাইকগাছা পৌর এলাকায় রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ায় এর নমুনা পরীক্ষার জন্য আজ রোববার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) কাছে পাঠানো হচ্ছে। তারা কোনো একটি সরকারি ল্যাবে এই মাংস পরীক্ষা করবে। ল্যাব টেস্টের ফল জানতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগতে পারে বলে তথ্য দিয়েছেন বিএফএসএ খুলনা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান। ইতিমধ্যেই ওই মাংসের কাঁচা ও রান্না করা নমুনা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে তথ্য দিয়ে মোকলেছুর রহমান বলেন, নমুনা কোন ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রান্নার পর গরুর মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার মত ঘটনা এবারই বাংলাদেশে প্রথম ঘটেছে। ফলে অভিজ্ঞতা না থাকায় দেশের কোনো বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এর ব্যাখ্য দিতে পারছেন না। তারাও ‘ল্যাব টেস্টের’ ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছেন। খুলনার পাইকগাছা পৌর এলাকার মডার্ন বেকারির কর্মচারীরা বুধবার পিকনিকের জন্য কেনা গরুর মাংস রান্না করতে গেলে, সেটি সবুজ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। পরে রান্না করা মাংস ভর্তি কড়াই নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ও থানায় যান তারা। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার কারণ জানতে কথা হয় দেশের কয়েকজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের অনুমান, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্যান্য অণুজীবের কারণে মাংস সবুজ হতে পারে। আবার রান্নার সময় উচ্চ তাপে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেও কখনো কখনো এমন হতে পারে। বিএফএসএর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (খাদ্যবাহিত নজরদারি) শাওরিন ইসলাম বলেন, “আমি তো ছয় বছর ধরে চাকরি করি; মাংসের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায় এমন কিছু শুনি নাই। খুলনার পুরো ঘটনা মোখলেস (বিএফএসএ খুলনা জেলার কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান) বলেছে। “মাংসের মধ্যে কোনো ছত্রাক বা রাসায়নিক আছে বলে মনে হয়নি। রান্নার পাত্রে বা মসলায় এসব থাকতে পারে।” স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি না থাকলেও এ ধরণের মাংস না খাওয়াই ভাল বলে পরামর্শ এই বিজ্ঞানীর। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (আইএফএসটি) সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. সাদিয়া আফরিন বলেন, “আমার চাকরি ও ব্যক্তিগত জীবনে এ ধরণের অভিজ্ঞতা হয়নি, দেখিওনি। তবে কখনো কখনো বিভিন্ন ধরণের মশলা দেওয়ার কারণে মাংস খানিকটা সবুজ হয়ে যেতে পারে। “খুলনার ভিডিও আমরাও দেখেছি। দেখে মনে হচ্ছে রঙ মেশান। নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে তারপর বলা যেতে পারে, এটা অন্য কোনো প্রাণীর মাংস কিনা।” যেসব প্রাণীর মাংস সাধারণত খাওয়া হয় রান্নার পর সেগুলো সবুজ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে কিনা এমন প্রশ্নে ড. সাদিয়া বলেন, “আমরা সচারাচর যে ধরণের মাংস খাই যেমন- ছাগল, মুরগি এ ধরণের মাংসে সবুজ রঙ আসবে না। যে ধরণের মাংস আমরা সচারাচর খাই না বা হালালের মধ্যে পড়ে না ওই জাতীয় হলেও হতে পারে। ল্যাব টেস্ট ছাড়া আসলেও কেউ বলতে পারবে না।” বিএফএসএ এর মনিটরিং অফিসার (পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ) আসলাম উদ্দিন বলেন, “পরিদর্শণ ও পর্যবেক্ষণে সরাসরি এ ধরণের মাংস পাইনি। এরকম সবুজ মাংস পাওয়ার রেকর্ড নেই।” খুলনার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান বলেন, “সবুজ হয়ে যাওয়া মাংসের কাঁচা ও রান্না করা নমুনা রোববার (আজ) বিএফএসএর কাছে পাঠানো হবে। দোকানদারের কাছে ৫০০ গ্রামের মত মাংস অবশিষ্ট ছিল। সেটা এবং রান্না করা মাংস হাফ কেজির মত ছিল- এগুলো সংগ্রহ করে রেখেছি। এটা সরাসরি বাহকের মাধ্যমে বিএফএসএর কাছে পাঠাতে হবে। তাই রোববারের আগে পাঠানো যাচ্ছে না। মাংস ল্যাবে পৌঁছানোর পর পরীক্ষার ফলাফল পেতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।” পরীক্ষার ফল পেতে কেন এক সপ্তাহ লাগবে সে প্রশ্নের জবাবে বিএফএসএর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাওরিন ইসলাম বলেন, “কোনো নমুনা পরীক্ষার জন্য আগে থেকেই পরীক্ষার নির্দিষ্ট বিষয় ঠিক করে দিতে হয়। মাংসের ঘটনায় কী পরীক্ষা করা উচিত, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। “এই পরীক্ষা করতে অন্তত সপ্তাহখানেক মত লাগতে পারে। ক্যামিক্যাল টেস্ট, মাইক্রোবাইলোজি টেস্ট করতে হতে পারে। যেহেতু সবুজ হয়ে গেছে, ছত্রাক থাকতে পারে। ক্যামিক্যাল থাকতে পারে। স্বনামধন্য সরকারি ল্যাবে এই পরীক্ষা হবে।” এদিকে তিন কারণে মাংসে সবুজ রঙ ধরতে পারে বলে অনুমান করছেন প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বাশার। তিনি বলেন, “মাংস লাল দেখায় মায়োগ্লোবিন প্রোটিনের কারণে। এটার সঙ্গে রিঅ্যাক্ট করে এমন কিছু মিনারেল যদি থাকে মাংসে, তাহলে রান্নার ফলে এই ধরণের অস্বাভাবিক রঙ হয়ে যাবে। তখন মাংস নষ্ট হয়ে যাবে, খাওয়া যাবে না। “আবার ব্যকটেরিয়াল কনটেমিনেশন যদি হয়, তাহলেও রঙ পাল্টে যেতে পারে। আমরা যখন রান্না করি অনেক ব্যকটেরিয়া মরে যায়। কিন্তু এমন একটি ব্যকটেরিয়া আছে, যা মাংসকে বিষাক্ত করে তোলে। তখনও রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়। এর ফলে বাজে একটি গন্ধ হবে। এটার কোন স্বাদ থাকবে না। তখনও মাংস খাওয়া যাবে না। “যে পাত্রে মাংসটা রান্না করছি সেটা যদি কপার বা মেটালিক হয় তার ক্যামিক্যাল রিঅ্যাকশনেও রঙ পাল্টাতে পারে। তাহলেও এই মাংস খাওয়া যাবে না।” তবে এই তিন কারণ খুবই দুর্লভ বলেও তথ্য দেন তিনি।