নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক-বাজেট সংলাপ

দেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের চাপ ও দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতি; অন্যদিকে নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ। এমন বাস্তবতায় জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ কেমন হতে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নকে সামনে রেখে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত হলো নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক-বাজেট সংলাপ- ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা। গতকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকে চলা এই সংলাপে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য, উন্নয়নকর্মী ও বিভিন্ন খাতের অংশীজনরা অংশ নেন। আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (ঈচউ) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। প্রবন্ধে বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, ভর্তুকির চাপ, ঋণঝুঁকি, কর অব্যাহতির বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। আলোচনায় উঠে আসে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে, যা অর্জনে প্রবৃদ্ধি দরকার হবে অন্তত ৪২ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখন মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়েও কম। একইসঙ্গে কর অব্যাহতি ও কর ছাড়ের মাধ্যমে সরকার যে রাজস্ব হারাচ্ছে, তার পরিমাণ প্রায় আদায়কৃত রাজস্বের সমান। বিশ্লেষকরা বলেন, সরকার যদি কর অব্যাহতির সংস্কার না করে, তাহলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ- কোনোটিই টেকসইভাবে সম্ভব হবে না। সংলাপে খাদ্য, বিদ্যুৎ, এলএনজি, কৃষি ও রেমিট্যান্স খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ার আশঙ্কার কথাও উঠে আসে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় আগামী অর্থবছরে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে। একইসঙ্গে কৃষি ভর্তুকি এবং প্রবাসী আয়ে নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখলেও অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে বলে মত দেওয়া হয়। আলোচনায় নবম পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। গবেষকরা বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হলেও এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উন্নয়ন বাজেট, ভর্তুকি কিংবা সামাজিক সুরক্ষা খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। নতুন সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার্স কার্ড’, মিড-ডে মিল, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য জনবান্ধব হলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্য যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অংশগ্রহণকারীরা। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে তথ্যভিত্তিক যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়। অন্যদিকে কৃষক কার্ড প্রকল্পে স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের দুর্বলতা নিয়েও সংলাপে তীব্র সমালোচনা হয়। গবেষণায় বলা হয়, ১ হাজার ৩৫২টি প্রকল্পের মধ্যে ৭৩৭টি ইতোমধ্যে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে এবং বহু প্রকল্প সময়মতো শেষ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া অনেক প্রকল্পকে ‘জম্বি প্রকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এসব প্রকল্প বছরের পর বছর সামান্য বরাদ্দ নিয়ে টিকে থাকছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি নেই। এতে সময় ও অর্থ- দুটোরই অপচয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন বাজেটে সরকারকে প্রকল্প বাছাইয়ে কঠোর হতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিতে হবে। প্রবন্ধে বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করা হয়। আইএমএফ ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে ‘মধ্যম ঝুঁকির ঋণঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকার ক্রমেই ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। আলোচনার শেষ অংশে গবেষকরা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। কারণ সরকারকে একইসঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার, আইএমএফের শর্ত, রাজস্ব বৃদ্ধি, ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি- সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়, এই বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি হবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতারও পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব বাড়াতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর।