এইচএসসির ফল প্রকাশ, গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২। যা গতবছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সেই হিসাবে পাসের গতবছরের তুলনায় কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফল উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ও অনলাইনে একযোগে প্রকাশিত হচ্ছে। পরীক্ষায় এবছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছর যেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন পরীক্ষার্থী। সেই হিসাবে এবছর জিপিএ-৫ কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। চলতি বছর সারাদেশে এইচএসসি-আলিম-এইচএসসি (বিএম-বিএমটি) বা এইচএসসি (ভোকেশনাল) বা ডিপ্লোমা-ইন-কমার্স পরীক্ষায় ১১টি বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। তার মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম পাসের হার বরিশাল বোর্ডে, ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডের পর পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এরপর ময়মনসিংহ বোর্ডে ৫১ দশমিক ৪৪, সিলেট বোর্ডে ৫০ দশমিক ৯০, কুমিল্লা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ০৪, দিনাজপুর বোর্ডে ৪৫ দশমিক ৯৮, রাজশাহী বোর্ডে ৪৫ দশমিক ০৬, যশোর বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৯২ এবং বরিশাল বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সব বোর্ড মিলিয়ে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। ৮ আগস্ট পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বন্যার কারণে চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বোর্ডের পরীক্ষা শেষ করতে আরও সময় লাগে। মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৯৭টি এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৪৩৯টি। এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ২ জুলাই শুরু হয়েছিল এবং ৮ আগস্ট শেষ হয়েছে। ব্যবহারিক পরীক্ষা ১৫ আগস্টের মধ্যে শেষ হয়।
কমেছে পাসের হার, বেড়েছে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা: চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে। একইসঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। বেড়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন। সেই হিসাবে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনসহ শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯৩টিতে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে, শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার ১৩৯টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি। এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ২০৬টি। বোর্ডভিত্তিক ফল: সাধারণ শিক্ষা বোর্ড: ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ১৭৯ জন। পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এ বোর্ডগুলোতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড: মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় অংশ নেন ৮৯ হাজার ৩২১ জন। পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ২৫০ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড: কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও এইচএসসি (ডিপ্লোমা ইন কমার্স) পরীক্ষায় অংশ নেন ১ লাখ ২ হাজার ৯৪৭ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫০ হাজার ৮৮৯ জন। পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৮৬ জন।
পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা: এবারের ফলাফলে পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ, ছাত্রদের ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে। এবার পরীক্ষায় ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছাত্রী অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। অন্যদিকে ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলেরা এগিয়ে রয়েছেন। এবার ২০ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
বিদেশ কেন্দ্রের ফল: বিদেশের আটটি কেন্দ্রে এবার ২৯৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৬৯ জন। পাসের হার ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এসব কেন্দ্রে একটি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ঘটনা ঘটেনি। বিদেশ কেন্দ্রে কোনো পরীক্ষার্থী বহিষ্কৃত হননি। পরীক্ষা পরিচালনায় যেসব পদক্ষেপ: সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ইতিবাচক আন্তঃসম্পর্ক, শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, অভিভাবকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা পরিচালনা ফলাফল অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মন্ত্রী জানান, এবারের পরীক্ষা যথাসময়ে পূর্ণ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। উত্তরপত্র নির্ভুলভাবে মূল্যায়নের জন্য প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের কর্মশালার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। উত্তরপত্র মানসম্মতভাবে মূল্যায়নের লক্ষ্যে পরীক্ষকদের ৩০০টি উত্তরপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। এ ছাড়া সব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হয়। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে কেন্দ্রের প্রবেশদ্বারে পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা রাখা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের বসার জন্য শেড নির্মাণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন ৪ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থী: এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থীকে এক মাসের মধ্যে শুধু ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব শিক্ষার্থীকে পরবর্তী বছরের পরীক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ তথ্য জানান। এর আগে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্বর্তী পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেসময় জানানো হয়, দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ দুই মাসের মধ্যে এবং তিন বা তার বেশি বিষয়ে অকৃতকার্যদের ক্ষেত্রে তিন মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ওই সময় আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছিলেন, ফল প্রকাশের পর এক মাস পুনর্নিরীক্ষণের কাজ চলবে। পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হবে। এরপর পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে ফল প্রকাশ করা হবে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, দুই বিষয়ে পরীক্ষা হলে দুই মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব। তবে তিন বা তার বেশি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হলে তিন মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। কতটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এ সুযোগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সাধারণত এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে পরের বছর আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণেও একজন শিক্ষার্থীকে প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এতে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি মানসিক চাপও তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে এর আগে এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের তিন মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি এ কথা বলেন।