একসময় নগরের শ্বাসপ্রশ্বাস হিসেবে কাজ করা জলাধারগুলো এখন নোংরা পানি ও দুর্গন্ধের উৎসে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতনসহ শহরের বিভিন্ন অভিজাত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যে লেকগুলো ছিল মানুষের হাঁটা-চলা, সকালের হাওয়া ও শহুরে সৌন্দর্যের প্রতীক, সেগুলোতে এখন নিয়মিতভাবে পয়ঃবর্জ্য মিশছে। সাম্প্রতিক জরিপ ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব এলাকায় বাড়ির একটি বড় অংশে পয়ঃনিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা নেই; অনেক বাড়ি ওয়াসার পয়ঃনালার সঙ্গে সংযুক্ত নয়, সেপটিক ট্যাংক নেই বা কাজ করছে না, ফলে বাসিন্দারা সহজ পথ বেছে নিয়ে তাদের নোংরা পানি খোলা ড্রেন বা স্টর্ম লাইনে ঢেলে দিচ্ছেন এবং সেই লাইনগুলো সরাসরি খাল বা লেকে গিয়ে মিলছে। ফলশ্রুতিতে লেকের পানিতে ভাসমান ময়লা, শৈবাল বিস্তার ও দুর্গন্ধের মাত্রা বেড়ে গেছে; টেরেসে বসে কফি খাওয়ার রেওয়াজ বিলুপ্তপ্রায়, জানালা খুললেই ঘর থেকে বের হওয়া যায় না-এমনই অভিজ্ঞতা এখন লেকপাড়ের বাসিন্দাদের। এই সমস্যা কেবল গুলশান‑বনানী অঞ্চলের সীমাবদ্ধ নয়; শহরের বিভিন্ন কোণে থাকা ছোট বড় লেকগুলোতে একই ধাঁচের দূষণ দেখা যায়। অনেক জায়গায় ওয়াসার পয়ঃলাইন পুরনো, অপর্যাপ্ত বা অনুপস্থিত; স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইনগুলো মূলত বৃষ্টির পানি ও ধোয়া-ধুলোর জন্য নির্মিত, কিন্তু বাড়ির মালিকরা যখন তাদের নোংরা পানি সেগুলোতে সংযুক্ত করে দেন তখন স্টর্ম লাইনের মাধ্যমে বর্জ্য সরাসরি খালে বা লেকে পৌঁছে যায়। এদিকে, প্রশাসনিক অভিযানের সময় কিছু বাড়ির অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; অনেক বাড়ি কংক্রিট ঢালাই করে বা অন্যভাবে সংযোগ লুকিয়ে পুনরায় একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, অভিযানগুলো ছিল অস্থায়ী এবং নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এদিকে, লেকের দূষণ পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। পয়ঃবর্জ্য মিশে গেলে পানির অক্সিজেন কমে যায়, শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার বাড়ে, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবন সংকুচিত হয় এবং দুর্গন্ধ ও মশার প্রজনন বেড়ে যায়; এর ফলে ডেঙ্গু, প্যারাসাইটিক সংক্রমণ ও শ্বাসনালীজনিত অসুখের ঝুঁকি বাড়ে। হাতিরঝিলের মতো বড় জলাধারেও দূষণ ছড়িয়ে পড়লে শহরের জলচক্র ও মাইক্রোক্লাইমেটেও প্রভাব পড়ে; লেকগুলো শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, সেগুলো নষ্ট হলে নগর জীবনের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি লেকপাড়ের আবাসিক সম্পত্তির বাজারমূল্যও ধীরে ধীরে কমছে; একসময় লেকভিউ বাড়িগুলো ভাড়াটিয়াদের কাছে চাহিদাসূচক ছিল, এখন সেই আকর্ষণ হারিয়ে যাচ্ছে কারণ বাসিন্দারা জানালা খুললেই দুর্গন্ধে কষ্ট পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বছলেন, বাড়ির মালিকদের অবহেলা, ঢাকা ওয়াসার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সিটি করপোরেশনের তদারকির ঘাটতি-এই তিনটি মিলেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির পয়ঃবর্জ্য ওয়াসার পয়ঃনালায় সংযুক্ত করা উচিত; যেখানে তা সম্ভব নয়, সেখানে সেপটিক ট্যাংক স্থাপন করে স্থানীয়ভাবে শোধন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক বাড়ি হবরঃযবৎ ওয়াসার লাইনে সংযুক্ত নন হড়ৎ সেপটিক ট্যাংক স্থাপন করেছে, বরং খোলা ড্রেনেই বর্জ্য ফেলে দিচ্ছে। ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নগরীর জন্য একটি স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান আছে এবং পয়ঃলাইন সম্প্রসারণের কাজ চলছে, তবে তা সম্পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত লেকগুলোতে বর্জ্য পড়া বন্ধ করতে দ্রুত অস্থায়ী ও স্থায়ী সমাধান দরকার। সিটি করপোরেশনও ২০২৩ সালে কিছু অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করেছিল, কিন্তু পরে সেই বাধাগুলো অপসারণ বা ঢেকে ফেলা হয়েছে এবং পুনরায় বর্জ্য পড়া শুরু হয়েছে-এতে বোঝা যায় যে প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো পর্যাপ্ত নয় বা নিয়মিত অনুসরণ করা হচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানের জন্য একক নয়, সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, প্রতিটি লেকের আশপাশের বাড়িগুলোর পয়ঃসংযোগের একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করে ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে; কোন বাড়ি ওয়াসার লাইনে সংযুক্ত, কোন বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক আছে, কোনগুলো অবৈধভাবে স্টর্ম লাইনে সংযুক্ত-এসব তথ্য খোলামেলা করে প্রকাশ করা হলে দায়ীদের চিহ্নিত করা সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, যেখানে ওয়াসার লাইন নেই সেখানে অস্থায়ীভাবে কার্যকর বাধা বসিয়ে লেকের দিকে সরাসরি বর্জ্য পড়া রোধ করতে হবে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় মনিটরিং টিম গঠন করে নিয়মিত তদারকি ও জরিমানা কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, সেপটিক ট্যাংক স্থাপনের জন্য আর্থিক সহায়তা বা সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করলে নিম্ন আয়ের বাড়িও মালিক সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত হবে। চতুর্থত, ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় ত্বরান্বিত করে পয়ঃলাইন নির্মাণকে দ্রুততর করতে কেন্দ্রীয় তহবিল, পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগানো উচিত। পঞ্চমত, যারা নিয়ম ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃঢ় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে-জরিমানা, নির্মাণ অনুমতি স্থগিত বা লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ দৃষ্টান্তমূলক প্রভাব ফেলবে। তবে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোই সব নয়; সামাজিক আচরণগত পরিবর্তনও জরুরি। লেকপাড়ের বাসিন্দা, স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে যাতে ‘নো‑ডাম্পিং’ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। স্থানীয় কমিউনিটি যদি নিয়ম মানার জন্য সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে চালক বা বাড়ির মালিকরা সহজে অবৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারবে না। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট‑স্কেল পয়ঃশোধন ইউনিট স্থাপন করে স্থানীয়ভাবে বর্জ্য শোধন ও পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব; এই ধরনের ডেসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং লেকের ওপর চাপ কমাবে।
নিয়মিতভাবে পয়ঃবর্জ্য মিশছে রাজধানীর লেকগুলোতে
