ফেনীকে রক্ষায় ১৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প

ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ফেনীতে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। এর আওতায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর উন্নয়ন, নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসনসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অবকাঠামোগত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীভাঙন রোধ করা। পাশাপাশি টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের যাতায়াত সুবিধা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ও কৃষিজমিসহ প্রায় ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৩৫ টন কৃষিপণ্য, ১৫ টন মৎস্যসম্পদ এবং ২৫ টন পোলট্রি উৎপাদন বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে। এছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ২ হাজার ৩৭০ জন এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্বাসন, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামোর সংস্কার, একটি হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ এবং তিনটি রেগুলেটর বা সারফেস ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মুহুরী ও সিলোনিয়া নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অপরদিকে কহুয়া নদীটি ফ্লাড বাইপাস হিসেবে খনন করা হয়েছিল, যা বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়া, পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় ব্যাপক বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে ত্রিপুরা ও ফেনীতে টানা বর্ষণ এবং উজানের ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় জেলার সবকটি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই দুর্যোগে ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ কারিগরি সমীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাহাড়ি ঢলের চাপ সহ্য করতে সক্ষম টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেনীর বন্যা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং সীমান্তবর্তী এলাকার লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।